১৯৬৬ সালে অস্ট্রেলিয়ান বিজ্ঞানী এম. ডি. হ্যাচ (M. D. Hatch) এবং সি. আর. স্ল্যাযাক (C. R. Slack) সালোকসংশ্লেষণের আলোক নিরপেক্ষ পর্যায়ে কার্বন আত্তীকরণের যে গতিপথ বর্ণনা করেন তাকে হ্যাচ–স্ল্যাক চক্র বলে। তাঁরা প্রমাণ করেন, সালোকসংশ্লেষণে উৎপন্ন প্রথম স্থায়ী যৌগ চার কার্বন বিশিষ্ট অক্সালো অ্যাসিটিক এসিড (OAA)। তাই একে C4 চক্র বলা হয়। এই চক্রটি ডাইকার্বোক্সিলিক চক্র নামেও পরিচিত। ১৯৭০ সালে এটি হ্যাচ–স্ল্যাক চক্র নামে স্বীকৃতি পায়। ১৯৬৫ সালে হুগো কর্টসচক (Hugo Kortschak), হার্ট (Harrt) এবং জর্জ বার (George Burr) প্রথম লক্ষ্য করেন যে, আখ গাছের পাতায় CO2 বিজারণের সময় প্রথম স্থায়ী পদার্থ হিসেবে অক্সালো অ্যাসিটিক এসিড উৎপন্ন হয়। C4 গতিপথের ধারাবাহিক বিক্রিয়াগুলো বিজ্ঞানী Hatch, Slack ও Kortschak আবিষ্কার করেন বলে এই চক্রকে HSK গতিপথও বলা হয়। বর্তমানে ১৬টি গোত্রের বহু উদ্ভিদে এই গতিপথ আবিষ্কৃত হয়েছে।
Category: Biology Second Paper
C3 উদ্ভিদের উদাহরণ
C4 উদ্ভিদ ব্যতীত অন্য সকল উদ্ভিদ হলো C3 উদ্ভিদ। যেমন- ধান, গম, বার্লি/জোয়ার, আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, কলা, পাট, শৈবাল, ব্রায়োফাইটা, টেরিডোফাইটা, নগ্নবীজী প্রভৃতি।
C3 উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য কী কী
১। C3 উদ্ভিদ শীত প্রধান দেশ হতে উৎপত্তি লাভ করেছে।
২। C3 উদ্ভিদ উচ্চ তাপমাত্রায় খাপখাইয়ে নিতে অক্ষম।
৩। ১০-২৫ ডিগ্রী সে তাপমাত্রা এদের জীবন ধারণের জন্য সহজ।
৪। C3 উদ্ভিদের পাতায় ক্র্যাঞ্জ অ্যানাটমি থাকে না।
৫। এদের পাতার বান্ডলসীথকে ঘিরে মেসোফিল কোষের স্তর থাকে না।
৬। C3 উদ্ভিদের মেসোফিল কোষে ক্যালভিন-ব্যাশাম চক্র ঘটে।
৭। এদের CO2 বিজারণ হার কম।
৮। C3 উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণের হার কম।
৯। এদের প্রস্বেদন ও ফটোরেসপিরেশন বেশি ঘটে।
১০। এদের ক্লোরোপ্লাস্ট গঠনগত ভাবে একই ধরনের।
১১। বায়ুমন্ডলের CO2 এর ঘনত্ব ৫০-১৫০ ppm হলে এদের সালোকসংশ্লেষণ সবচেয়ে ভাল হয় ।
১২। C3 উদ্ভিদের স্টোম্যাটা দিনের বেলা খোলা থাকে এবং রাতে বন্ধ থাকে।
১৩। C3 উদ্ভিদের অধিকাংশ বিক্রিয়া একমুখী।
১৪। এরা পানি অপচয় বেশি করে এবং শুষ্ক অঞ্চলে অভিযোজিত হতে পারে না।
১৫। C3 উদ্ভিদের মেসোফিল কোষে রাইবুলোজ বিসফসফেট কার্বোক্সিলেজ এনজাইমের কার্যকারীতা যথেষ্ট।
১৬। বান্ডলসীথ ক্লোরোপ্লাস্টে এবং মেসেফিল ক্লোরোপ্লাস্টে স্টার্চ দানা থাকে।
১৭। রুবিস্কো এনজাইমের কার্যকারীতা বান্ডলসীথ এবং মেসোফিল উভয় কোষে ঘটে।
১৮। বায়ুমন্ডলে ২০% এর বেশি O2 থাকলে C3 উদ্ভিদের কার্বন বিজারণ বাধাগ্রস্ত হয়।
C3 উদ্ভিদ কী ।। C3 Plants কী
যে সব উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণে কার্বন আত্তীকরণের সময় প্রথম স্থায়ী যৌগ হিসেবে তিন কার্বন বিশিষ্ট ৩-ফসফোগিøসারিক এসিড উৎপন্ন করে তাদেরকে C3 উদ্ভিদ বলে।
ক্যালভিন-ব্যাশাম চক্র ।। ক্যালভিন-ব্যাশাম চক্রের গুরুত্ব ।। C3 চক্রের গুরুত্ব
১। এই চক্রে CO2 এর সাথে RuBP যুক্ত হয়ে PGA উৎপন্ন করে। PGA থেকে PGAld সৃষ্টি হয়।
২। PGAld থেকে ধারাবাহিক ভাবে বিক্রিয়ার মাধ্যমে জটিল শর্করা উৎপন্ন হয়।
৩। ক্যালভিন চক্রে CO2 শোষিত হয়। ফলে পরিবেশে CO2 এর পরিমাণ স্বাভাবিক থাকে।
৪। ক্যালভিন চক্রের মাধ্যমে RuBP এর পুনরুৎপাদন ঘটে এবং ইহা আলোক নিরপেক্ষ দশার ধারাবাহিকতা বজায় রাখে।
৫। ক্যালভিন চক্রে উৎপন্ন বিভিন্ন যৌগ উদ্ভিদের বিপাক ক্রিয়ায় অংশ গ্রহণ করে।
৬। ক্যালভিন চক্রে উৎপন্ন জাইলুলোজ উদ্ভিদের কোষপ্রাচীর গঠনে সহায়তা করে।
৭। ক্যালভিন চক্রে উৎপন্ন গ্লুকোজ পলিমার গঠনের মাধ্যমে সেলুলোজ ও শে^তসার গঠন করে।
C3 চক্র কোথায় ঘটে ।। ক্যালভিন-ব্যাশাম চক্র কোথায় ঘটে
শৈবাল, ব্রায়োফাইটা, টেরিডোফাইটা এবং নগ্নবীজী উদ্ভিদে C3 চক্র ঘটে। অধিকাংশ দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদে এবং কিছু কিছু একবীজপত্রী উদ্ভিদে C3 চক্র ঘটে। ধান, গম, বার্লি/জোয়ার, আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, কলা, পাট, শৈবাল, ব্রায়োফাইটা, টেরিডোফাইটা, নগ্নবীজী প্রভৃতি উদ্ভিদে C3 চক্র ঘটে।
রুবিস্কো এনজাইম কী ।। Rubisco enzyme কী
রাইবুলোজ বিসফসফেট কার্বোক্সিলেজ বা অক্সিজিনেজ এনজাইমের অ্যাক্রোনিম (acronym) হলো রুবিস্কো এনজাইম। রুবিস্কো এনজাইম হলো পৃথিবীর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এনজাইম। এই এনজাইম প্রাকৃতিক জগৎ এবং জীবজগতের মধ্যে রাসায়নিক বন্ধন তৈরী করে। তাই একে সেতু বা বন্ধন এনজাইম বলা হয় । পাতার মোট প্রোটিনের ৫০ ভাগ বা তারও বেশি হলো রুবিস্কো এনজাইম। পৃথিবীতে রুবিস্কো এনজাইমের পরিমাণ প্রায় ৪০ মিলিয়ন টন। এই এনজাইমের সাহায্যে পৃথিবীতে প্রতি বছর ১০০ বিলিয়ন টন CO2 কার্বোহাইড্রেটে রুপান্তরিত হয়।
ক্যালভিন-ব্যাশাম বা C3 চক্রের ধাপসমুহ আলোচনা ।। ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
১। কার্বোক্সিলেশন (Carboxylation)
(i) রুবিস্কো এনজাইমের কার্যকারীতায় রাইবুলোজ ১, ৫ বিসফসফেট বায়ুমন্ডলের CO2 এর সাথে বিক্রিয়া করে ৬ কার্বন বিশিষ্ট (C6) কিটো এসিড উৎপন্ন করে। কিটো এসিডটি দ্রুত ভেঙ্গে ৩-ফসফোগ্লিসারিক এসিডে পরিনত হয়। (RuBisCO হলো পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এনজাইম)
২। ফসফোরাইলেশন (Phosphorylation)
(ii) ফসফোগ্লিসারোকাইনেজ নামক এনজাইমের সহায়তায় ৩-ফসফোগ্লিসারিক এসিড ১, ৩ বিসফসফোগ্লিসারিক এসিডে রুপান্তরিত হয়। এ সময় বিক্রিয়ায় ATP অংশ গ্রহণ করে ADP উৎপন্ন করে।
৩। রিডাকশন (Reduction)
(iii) ফসফোগ্লিসারালডিহাইড ডিহাইড্রোজিনেজ এনজাইমের প্রভাবে ১, ৩ বিসফসফোগ্লিসারিক এসিড হতে ৩-ফসফোগ্লিসারালডিহাইড ও ডাইহাইড্রোক্সি অ্যাসিটোন ফসফেট উৎপন্ন হয়। এ সময় বিক্রিয়ায় NADPH+H+ অংশ গ্রহণ করে NADP গঠন করে।
৪। কার্বোহাইড্রেট উৎপাদন (Carbohydrate production)
(iv) অ্যালডোলেজ এনজাইমের কার্যকারীতায় ৩-ফসফোগ্লিসারালডিহাইড হতে ফ্রুক্টোজ ১, ৬ বিসফসফেট উৎপন্ন হয়।
(v) ফসফোফ্রুক্টোকাইনেজ এনজাইমের উপস্থিতিতে ফ্রুক্টোজ ১, ৬ বিসফসফেট, ফ্রুক্টোজ ৬-ফসফেটে রুপান্তরিত হয়। এ সময় বিক্রিয়ায় ADP অংশ গ্রহণ করে ATP উৎপন্ন করে।
(vi) ফসফোগ্লুকো আইসোমারেজ এনজাইমের প্রভাবে ফ্রুক্টোজ ৬ ফসফেট হতে গ্লুকোজ ৬-ফসফেট উৎপন্ন হয়।
(vii) হেক্সোকাইনেজ এনজাইমের কার্যকারীতায় গ্লুকোজ ৬-ফসফেট হতে গ্লুকোজ উৎপন্ন হয়। এ সময় বিক্রিয়ায় ADP অংশ গ্রহণ করে ATP গঠন করে।
৫। RuBP পুনঃউৎপাদন (Regeneration of RuBP)
(viii) ৩-ফসফোগ্লিসারালডিহাইড এবং ফ্রুক্টোজ ১, ৬ বিসফসফেট বিক্রিয়া করে রাইবুলোজ ৫ ফসফেট উৎপন্ন করে।
(ix) রাইবুলোজ ৫ ফসফেট থেকে রাইবুলোজ ১, ৫ বিসফসফেট উৎপন্ন হয়। রাইবুলোজ ১, ৫ বিসফসফেট পুনরায় ক্যালভিন-ব্যাশাম চক্রে প্রবেশ করে চক্রটিকে সচল রাখে।
ক্যালভিন-ব্যাশাম চক্রের প্রয়োজনীয় উপাদান
১। ATPঃ চক্রীয় ও অচক্রীয় ফটোফসফোরাইলেশন প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন ATP ক্যালভিন চক্রে প্রয়োজনীয় শক্তির যোগান দেয়।
২। NADPH+H+ ঃ অচক্রীয় ফটোফসফোরাইলেশন প্রক্রিয়া উৎপন্ন NADPH+H+ এ চক্রে বিজারক হিসেবে কাজ করে।
৩। CO2 ঃ বায়ুমন্ডলের CO2 এই চক্রে শর্করা উৎপাদনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
৪। RuBP ঃ RuBP, CO2 এর সাথে যুক্ত হয়ে ক্যালভিন চক্র শুরু করে।
ক্যালভিন-ব্যাশাম চক্র ।। ক্যালভিন-ব্যাশাম চক্রের বৈশিষ্ট্য কী কী ।। C3 চক্রের বৈশিষ্ট্য কী কী ।। ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
১। ক্যালভিন চক্রের CO2 গ্রাহক হলো ১, ৫ রাইবুলোজ বিসফসফেট।
২। এ চক্রে উৎপন্ন প্রথম স্থায়ী যৌগ হলো তিন কার্বন বিশিষ্ট ৩-ফসফোগ্লিসারিক এসিড।
৩। এই চক্রটি বেশি ঘনত্বের CO2 (50-150 ppm) ঘটে।
৪। চক্রটি নিম্ন তাপমাত্রায় (১০-২৫ ডিগ্রী সে.) ঘটে।
৫। চক্রটি শুধু মাত্র মেসোফিল ক্লোরোপ্লাস্টে ঘটে। অর্থাৎ ক্লোরোপ্লাস্টের স্ট্রোমাতে ঘটে।
৬। ইহা কম আলোতে ঘটে।
৭। ইহা প্রধানত শীত প্রধান দেশের উদ্ভিদে ঘটে।
৮। প্রক্রিয়াটি C3 ও C4 উদ্ভিদে ঘটে।
৯। এই চক্রে CO2 ফিক্সিং এনজাইম হলো রুবিস্কো।
১০। এই চক্রের উদ্ভিদে ফটোরেসপিরেশন ঘটে।
১১। এ চক্রের উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণের হার কম।