ক্যালভিন-ব্যাশাম চক্র ।। সালোকসংশ্লেষণে কার্বন ডাই অক্সাইডের ভূমিকা

CO2 হলো শর্করা তৈরীর প্রধান কাঁচামাল। বায়ুমন্ডলে  CO2 এর পরিমাণ .০৩% বায়ুমন্ডলের % CO2 সালোকসংশ্লেষণে ব্যবহার হয়। ক্লোরোপ্লাস্টে পানি CO2 এর রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে। সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় এক অণু  গ্লুকোজ উৎপাদনের জন্য অণু CO2 প্রয়োজন হয়।

সালোকসংশ্লেষণে CO2 মিকা

(i) CO2 সালোকসংশ্লেষণে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হয়।

(ii) সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন শর্করার উৎস হলো CO2

(iii) কার্বন ডাই অক্সাইডের কার্বন কণা কোষের যৌগের সাথে যুক্ত হয়ে যায়।

সালোকসংশ্লেষণ ।। সালোকসংশ্লেষণে ক্লোরোফিলের ভূমিকা

ক্লোরোফিল সালোকসংশ্লেষণের প্রধান রঞ্জক পদার্থ। ক্লোরোপ্লাস্টের কোয়ান্টোজোমের ভিতরে ক্লোরোফিল থাকে। ক্লোরোফিলের রঞ্জক গুলো হলো ক্লোরোফিল a (সবুজ), ক্লোরোফিল b (নীলাভসবুজ), ক্লোরোফিল c, ক্লোরোফিল d, ক্লোরোফিল e, ক্যারোটিন (কমলা), জ্যান্থোফিল (হলুদ), ফাইকোসায়ানিন (নীল), ফাইকোইরিথ্রিন (লাল), ব্যাকটেরিওক্লোরোফিল, ক্লোরোবিয়াম ক্লোরোফিল প্রভৃতি। ক্লোরোফিল a  দুই রকম হয়ে থাকে। ক্লোরোফিল a 673  এবং ক্লোরোফিল a 683  ক্লোরোফিলের রাসায়নিক উপাদান গুলো হলোকার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন এবং ম্যাগনেসিয়াম। ব্যাকটেরিয়ার ক্লোরোফিলকে ব্যাকটেরিওক্লোরোফিল (C55H74O6N4Mg) বলে। যেমনRhodopseudomonas, Rhodospirillum, Chlorobium প্রভৃতি।

সালোকসংশ্লেষণে ক্লোরোফিলের মিকা

(i) সৌরশক্তিকে রাসায়নিক শক্তিতে পরিনত করে।

(ii) সালোকসংশ্লেষণ সংঘটনের স্থান হিসেবে কাজ করে।

(iii) ক্লোরোফিল আলোর ফোটন কণা শোষণ করে।

সালোকসংশ্লেষণ ।। সালোকসংশ্লেষণে আলোর ভূমিকা

(i) সৌরশক্তি ADP-কে ATP-তে পরিনত হতে সাহায্য করে।

(ii) আলো পত্ররন্ধ্র খোলা ও বন্ধ হওয়া নিয়ন্ত্রণ করে।

(iii) সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় শক্তির যোগান দেয়।

(iv) ইহা ক্লোরোফিলের ইলেকট্রনকে উত্তেজিত করে। অর্থাৎ ক্লোরোফিলকে সক্রিয় করে।

(v) আলোর পরিমাণ ১০০ থেকে ৩,০০০ ফুট ক্যান্ডল বাড়িয়ে সালোকসংশ্লেষণের হার সর্বোচ্চ করা যায়।

ইমারসন ইনহ্যাজমেন্ট ইফেক্ট ।। Emerson enhancement effect

বিজ্ঞানী রবার্ট ইমারসন (Robert Emerson) ক্লোরেলা শৈবালের ক্লোরোপ্লাস্টে আলোকরশ্মি প্রয়োগ করে লক্ষ্য করেন, ৬৮০ nm তরঙ্গ দৈর্ঘ্যরে বেশি আলোতে সালোকসংশ্লেষণের হার কমতে থাকে। আলোক বর্ণালির লাল অংশে সালোকসংশ্লেষণের হার কমতে থাকাকে তিনি লোহিত দ্যুতি বা red drop নামে অ্যাখ্যা দেন। ইমারসন (Emerson) এবং তাঁর সহকর্মীরা ৬৮০ nm এর কম তরঙ্গ দৈর্ঘ্যরে আলোকরশ্মির সাথে ৬৮০ nm এর বেশি তরঙ্গ দৈর্ঘ্যরে আলোকরশ্মি একত্রে প্রয়োগ করে সালোকসংশ্লেষণ ঘটান। তাঁরা দেখতে পান মিশ্র আলোকরশ্মির সালোকসংশ্লেষণ হার ওই দুই প্রকার আলোকরশ্মির পৃথক সালোকসংশ্লেষণের হারের মিলিত যোগফলের চেয়ে বেশি। একে তাঁরা Emerson enhancement effect নামে অভিহিত করেন।

আলো ।। সালোকসংশ্লেষণকারী আলো

সূর্যের উত্তপ্ত কেন্দ্রে হাইড্রোজেন পরমাণু হিলিয়াম পরমাণুতে রুপান্তরিত হয়। ৪টি হাইড্রোজেন পরমাণু একটি হিলিয়াম পরমাণুতে পরিনত হয়। রুপান্তরের সময় যে শক্তি বিকিরিত হয় তাকে ফোটন কণা বলে। ফোটন কণা ইলেকট্রোম্যাগনেটিক তরঙ্গ হিসেবে পৃথিবীতে আসে। কসমিক-রে (০.০১-০.১), এক্স-রে (০.১-১০) ও গামা রশ্মির (১০-৩৯০) তরঙ্গ দৈর্ঘ্য অনেক কম এবং ইনফ্রারেড-রে (৭০০-১,০০,০০০) ও রেডিওম্যাগনেটিক রশ্মির (১,০০,০০০-α) তরঙ্গ দৈর্ঘ্য অনেক বেশি।
যে আলো দৃশ্যমান (দেখা যায়) তাকে সাদা আলো বলে। দৃশ্যমান আলোকরশ্মির তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ৩৯০-৭৬০ ন্যানোমিটার। সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় কেবল মাত্র দৃশ্যমান আলোকরশ্মি ব্যবহার হয়। দৃশ্যমান আলোকরশ্মিতে ৭টি বর্ণের আলো থাকে (বেনিআসহকলা)। এই আলোগুলোকে বর্ণালী বা বর্ণচ্ছটা (light spectrum) বলে। বর্ণালীর তরঙ্গদৈর্ঘ্য হলো বেগুনী ৩৯০-৪৩০ nm, নীল ৪৩০-৪৭০ nm, আসমানী ৪৭০-৫০০ nm, সবুজ ৫০০-৫৬০ nm, হলুদ ৫৬০-৬০০ nm, কমলা ৬০০-৬৫০ nm এবং লাল ৬৫০-৭৬০ nm।
এক অণু CO2 বিজারিত করতে ৮-১০টি ফোটন কণা দরকার হয়। ফোটনের এই সংখ্যাকে কোয়ান্টা বলে। এক অণু গ্লুকোজ তৈরীতে ৫০-৬০টি ফোটন কণা ব্যবহার হয়। বস্তুর উপর পতিত আলোকতরঙ্গের যে পরিমাণ শোষিত হয় তাকে শোষণ বর্ণালী বলে। আপতিত সূর্যালোকের ৮৩% সবুজ পাতা দ্বারা শোষিত হয়, ১২% বায়ুমন্ডলে প্রতিফলিত হয় এবং ৫% ভূগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। সবুজ পাতা দ্বারা শোষিত আলোশক্তির মধ্যে ০.৫-৩.৫% ক্লোরোফিল এবং অন্যান্য পিগমেন্ট কর্তৃক শোষিত হয়। সালোকসংশ্লেষণে বেগুনি, নীল, কমলা ও লাল আলো বেশি ব্যবহার হয়। লাল ও নীল আলোতে সালোকসংশ্লেষণের হার বেশি। তবে একক আলো হিসেবে লাল আলোতে সালোকসংশ্লেষণের হার সবচেয়ে বেশি।

সালোকসংশ্লেষণ ।। সালোকসংশ্লেষণে পানির ভূমিকা ।। Water

উদ্ভিদ মূলরোম বা রাইজয়েড দ্বারা মাটি হতে কৈশিক পানি শোষণ করে। শোষিত পানি পাতার মেসোফিল টিস্যুতে পৌছে। এরপর মেসোফিল টিস্যু হতে ক্লোরোপ্লাস্টে প্রবেশ করে। ক্লোরোপ্লাস্টে পানি ও CO2 এর রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে। আলোর উপস্থিতিতে পানির অণুর ফটোলাইসিস ঘটে H+ ও O2 উৎপন্ন হয়। সালোকসংশ্লেষণে ১২ অণু পানি থেকে এক অণু গ্লুকোজ উৎপন্ন হয়।
সালোকসংশ্লেষণে পানির ভ‚মিকা
(i) সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় উপজাত পদার্থ হিসেবে যে অক্সিজেন উৎপন্ন হয় তা পানি থেকে আসে।
(ii) পানি সালোকসংশ্লেষণে প্রধান কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হয়।
(iii) সালোকসংশ্লেষণের অন্ধকার পর্যায়ে কার্বন ডাই অক্সাইডকে বিজারিত করার সময় হাইড্রোজেন দরকার হয়। পানি থেকে হাইড্রোজেন উৎপন্ন হয়।
(iv) ইহা ক্লোরোফিল অণুকে ইলেকট্রন প্রদান করে।

ফাইকোবিলিনস ।। ফাইকোবিলিনস কী ।। Phycobilins কী

ফাইকোসায়ানিন, ফাইকোইরিথ্রিন এবং অ্যালো-ফাইকোসায়ানিনকে একত্রে ফাইকোবিলিনস বলে। সাত প্রকার ফাইকোবিলিন পাওয়া যায়। সায়ানোব্যাকটেরিয়া এবং লোহিত শৈবালে ফাইকোবিলিনস থাকে। ফাইকোবিলিনস আলোক শক্তি ধারণ করে এবং সালোকসংশ্লেষণে সহায়তা করে। লাল বর্ণের ফাইকোবিলিনকে ফাইকোএরিথ্রিন বলে। ইহা নীলাভ-সবুজ বর্ণের আলো শোষণ করে। এর রাসায়নিক সংকেত C34H46O8N4। নীল বর্ণের ফাইকোবিলিনকে ফাইকোসায়ানিন বলে। ইহা কমলা বর্ণের আলো শোষণ করে। এর রাসায়নিক সংকেত C34H46O8N4।

ক্যারোটিনয়েডস ।। ক্যারোটিনয়েডস কী ।। Carotinoids কী

কমলা বর্ণের ক্যারোটিন এবং হলুদ বর্ণের জ্যান্থোফিলকে একত্রে ক্যারোটিনয়েডস বলে। ক্যারোটিনয়েডস দুই ধরনের। ক্যারোটিন এবং জ্যান্থোফিল।

(i) ক্যারোটিন ঃ ক্যারোটিন অসম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বন যৌগ। এর রাসায়নিক সংকেত C40H56O। ইহা চার ধরনের হয়। ক্যারোটিন a, b, c ও d। ইহা নীলচে বেগুনী আলো (449-478nm) সর্বাধিক শোষণ করে। ক্যারোটিনের বর্ণ বৈচিত্র্য সবচেয়ে আকর্ষণীয়। অ্যাভোক্যাডোতে সবুজ, টমেটোতে লাল, গাজরে লালচে কমলা এবং বিভিন্ন ফুলে হলুদ বর্ণের ক্যারোটিন পাওয়া যায়।

(ii) জ্যান্থোফিলঃ অক্সিজেনযুক্ত ক্যারোটিনকে জ্যান্থোফিল বলে। এর রাসায়নিক সংকেত C40H56O2। জ্যান্থোফিলের মধ্যে সবুজ উদ্ভিদে লিউটিন, টমেটোতে লাইকোজ্যান্থিন এবং ভূট্রায় জিয়াজ্যান্থিন পাওয়া যায়।

ক্লোরোফিলকী ।। সালোকসংশ্লেষণে ক্লোরোফিলের ভুমিকা ।। Chlorophyll ।। ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

ক্লোরোফিল হলো সবুজ বর্ণের সালোকসংশ্লেষণকারী কণিকা। পাতার মেসোফিল টিস্যুতে ক্লোরোপ্লাস্ট অধিক পরিমাণে থাকে। সবুজ উদ্ভিদে পাঁচ ধরনের ক্লোরোফিল থাকে। ক্লোরোফিল a, b, c, d ও e। ক্লোরোফিল-a হলদে-সবুজ বর্ণের এবং ক্লোরোফিল-b নীলাভ-সবুজ বর্ণের। কিছু ক্লোরোফিল- a (P-700) 700 nm তরঙ্গ দৈর্ঘ্যরে আলোকরশ্মি বেশি শোষণ করে, আবার কিছু ক্লোরোফিল- a (P-680) 680 nm তরঙ্গ দৈর্ঘ্যরে আলোকরশ্মি বেশি শোষণ করে। এসব ক্লোরোফিল সালোকসংশ্লেষণে অংশ গ্রহণ করে। থাইলাকয়েডের কোয়ান্টোজোমে আলোক বিক্রিয়া এবং স্ট্রোমা অংশে আলোক নিরপেক্ষ বিক্রিয়া ঘটে। আধুনিক বিজ্ঞানীরা মনে করেন, ক্লোরোফিল- a দ্বারা শোষিত আলোক শক্তি সালোকসংশ্লেষণে কাজে লাগে। অন্যান্য রঞ্জক পদার্থ কর্তৃক শোষিত আলোক শক্তি ক্লোরোফিল-a কে প্রদান করে। কতিপয় সবুজ সালফার ব্যাকটেরিয়া রোডোসিউডোমোনাস, রোডোস্পাইরিলাম, ক্লোরোবিয়াম প্রভৃতিতে ব্যাকটেরিওক্লোরোফিল থাকে। ক্লোরোফিলের রাসায়নিক উপাদান হলো- কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন এবং ম্যাগনেসিয়াম।
ক্লোরোফিল-a ঃ C55H72O5N4Mg
ক্লোরোফিল-b ঃ C55H70O6N4Mg
ক্লোরোফিল-c ঃ C35H30O5N4Mg
ক্লোরোফিল-d ঃ C54H70O6N4Mg
সালোকসংশ্লেষণে ক্লোরোফিলের ভূমিকা
সালোকসংশ্লেষণে ক্লোরোফিল সৌরশক্তিকে রাসায়নিক শক্তিতে রুপান্তর করে। ইহা সুর্যালোকের ফোটন কণা বা কোয়ান্টাম শোষণ করে সক্রিয় হয় এবং পানির অণুকে বিশ্লিষ্ট করে H+ ও OH- উৎপন্ন করে।

সালোকসংশ্লেষণ ।। সালোকসংশ্লেষণকারী জীব কী কী

১। সালোকসংশ্লেষণকারী উদ্ভিদঃ সালোকসংশ্লেষণকারী রঞ্জকযুক্ত ব্যাকটেরিয়া, শৈবাল, নীলাভ সবুজ শৈবাল এবং ক্লোরোফিলযুক্ত সকল উদ্ভিদে সালোকসংশ্লেষণ ঘটে।

২। সালোকসংশ্লেষণকারী কান্ডঃ কচি কান্ড, ক্লোরোফিলযুক্ত সবুজ কান্ড, পুঁইশাক, লাউ, কুমড়া, ফণিমনসার পর্ণকান্ড প্রভৃতিতে সালোকসংশ্লেষণ ঘটে।

৩। সালোকসংশ্লেষণকারী মূলঃ গুলঞ্চের আত্তীকরণ মূল এবং অর্কিডের বায়বীয় মূলে সালোকসংশ্লেষণ ঘটে।

৪। সালোকসংশ্লেষণকারী এককোষী জীবঃ ইউগেøনা, ক্লোরেলা, ক্রাইস্যামিবা প্রভৃতি এককোষী জীবে সালোকসংশ্লেষণ ঘটে।

৫। সালোকসংশ্লেষণে অক্ষম উদ্ভিদঃ পরজীবী, মৃতজীবী, ছত্রাক প্রভৃতি জীবে সালোকসংশ্লেষণ ঘটে না।