ইমবাইবিশন কী ।। Imbibition কী

যে প্রক্রিয়ায় কলয়েড জাতীয় শুষ্ক বা আংশিক শুষ্ক পদার্থ দ্বারা তরল পদার্থ শোষিত হয় তাকে ইমবাইবিশন বলে। যে সব পদার্থ পানি শোষণ করে স্ফীত হয় তাদেরকে হাইড্রোফিলিক পদার্থ বলে। যেমনআঠা, সেলুলোজ, জেলাটিন, প্রোটিন, স্টার্চ ইত্যাদি।

পানি পরিশোষণ বর্ণনা ।। Water absorption

যে প্রক্রিয়ায় কোষের বহিঃস্থ কোন উৎস হতে কোষাভ্যন্তরে পানি প্রবেশ করে তাকে পানি পরিশোষণ বলে। উচ্চ শ্রেণীর উদ্ভিদ মূল দ্বারা, নিম্নশ্রেণীর উদ্ভিদ রাইজয়েড দ্বারা এবং জলজ উদ্ভিদ সমগ্র দেহ দ্বারা পানি পরিশোষণ করে। মূলরোম হলো উদ্ভিদের পানি পরিশোষণের মুখ্য অঙ্গ। মূলরোম মাটির কণার ফাঁকে ফাঁকে বিস্তৃত থাকে। অপরদিকে, মাটির কণার ফাঁকে ফাঁকে প্রচুর পরিমাণে কৈশিক পানি থাকে। মাটির কণার ফাঁকে অবস্থিত কৈশিক পানির ঘনত্ব মূলরোমের কোষ রসের ঘনত্ব অপেক্ষায় কম হওয়ায় ব্যাপন চাপ ঘাটতি দেখা দেয়। অর্থাৎ DPD কমে যায়। এই ব্যাপন চাপ ঘাটতির সমতা আনার জন্য অভিস্রবণ প্রক্রিয়ায় পানি মূলরোমে প্রবেশ করে।  এতে মুলরোম মূলত্বকের কোষরসের ঘনত্ব কমে যায়। কিন্তু কর্টেক্স কোষের কোষরসের ঘনত্ব বেশি থাকে। কারণে মুলত্বক কর্টেক্স কোষের মধ্যে ব্যাপন চাপ ঘাটতি দেখা দেয়। এই ব্যাপন চাপ ঘাটতির সমতা আনার জন্য পানি মূলত্বক হতে কর্টেক্সের প্রথম কোষে প্রবেশ করে। এরপর কর্টেক্সের দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম প্রভৃতি কোষের মধ্য দিয়ে পানি শেষ পর্যন্ত অন্তঃত্বকে পৌছে। এতে অন্তঃত্বকের কোষরসের ঘনত্ব কমে যায়, কিন্তু পেরিসাইকলের কোষরসের ঘনত্ব বেশি থাকে। ফলে একটি ব্যাপন চাপ ঘাটতি দেখা দেয়। এই চাপের ঘাটতির সমতা আনয়নের জন্য পানি অভিস্রবণ প্রক্রিয়ায় অন্তঃত্বক হতে পেরিসাইকলের ভিতর দিয়ে জাইলেমের ভেসেল গহ্বরে প্রবেশ করে। পরবর্তীতে জাইলেমের ভিতর দিয়ে পানি উদ্ভিদের প্রয়োজনীয় অংশে পৌছে যায়।

প্রভাবক ।। খনিজ লবণ পরিশোষণের প্রভাবক ।। ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

১। আয়নের ঘনত্বঃ মাটির দ্রবণে আয়নের ঘনত্ব বেশি হলে খনিজ লবণ পরিশোষণের হার বাড়ে। একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত আয়নের ঘনত্ব বাড়লে খনিজ লবণ পরিশোষণের হার বৃদ্ধি পায়।

২। তাপমাত্রাঃ একটি সংকীর্ণ সীমা পর্যন্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে খনিজ লবণ পরিশোষণের হার বৃদ্ধি পায়। তাপমাত্রা নির্দিষ্ট সীমা থেকে কম বা বেশি হলে পরিশোষণ হার কমে যায়।

৩। আলোঃ পরোক্ষভাবে আলো খনিজ লবণ পরিশোষণের হারকে বৃদ্ধি করে। আলো পত্ররন্ধ্র খোলা-বন্ধ হওয়া এবং প্রস্বেদনের হার নিয়ন্ত্রণ করে। তাই আলো খনিজ লবণ পরিশোষণ নিয়ন্ত্রণ করে।

৪। প্রস্বেদনঃ প্রস্বেদন হার বৃদ্ধি পেলে পরিশোষণ হারও বৃদ্ধি পায়। প্রস্বেদনের হার বাড়লে উদ্ভিদের মূল, কান্ড ও পাতায় পানি পরিবহন বৃদ্ধি পায়। ফলে খনিজ লবণ পরিশোষণের হারও বৃদ্ধি পায়।

৫। অক্সিজেনঃ অক্সিজেন কম হলে শ্বসন কম হয় এবং পরিশোষণ হারও কমে যায়।

৬। শ্বসনিক বস্তুঃ শ্বসনিক বস্তু কম থাকলে শ্বসন হার কমে যায় এবং খনিজ পরিশোষণও কমে যায়।

৭। আয়নের পারস্পরিক ক্রিয়াঃ Ca+ + ও  Mg+ + আয়নের উপস্থিতি K+ আয়নের শোষণকে বাধা দেয়।

৮। উদ্ভিদের বৃদ্ধিঃ উদ্ভিদের দৈহিক বৃদ্ধি খনিজ লবণ শোষণ হার বৃদ্ধি করে। তাই বৃহৎ উদ্ভিদ বেশি মাত্রায় এবং ক্ষুদ্র উদ্ভিদ কম মাত্রায় খনিজ লবণ পরিশোষণ করে।

৯। pH ঃ একটি নির্দিষ্ট সীমার বাইরে pH এর পরিবর্তন কোষের ক্ষতি সাধন করে। তাই খনিজ লবণ শোষণে ব্যাঘাত ঘটে।

১০। বৃদ্ধি অঞ্চলঃ উদ্ভিদের বৃদ্ধি অঞ্চল এবং কোষ বিভাজন অঞ্চলে খনিজ লবণ পরিশোষণ বেশি ঘটে।

প্রোটন-অ্যানায়ন সহপরিবহন । আধুনিক মতবাদ ।। Proton-Anion Co-transport Theory

যে প্রক্রিয়ায় প্রোটন ও অ্যানায়ন সহ অবস্থানের মাধ্যমে কোষের বাইরে থেকে কোষের ভিতরে প্রবেশ করে তাকে প্রোটন-অ্যানায়ন সহপরিবহন মতবাদ বলে। এই মতবাদটি পিটার মিশেল (Peter Mitchel, ১৯৬৮) এর কেমি-অসমোটিক মডেলের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত।

এই মতবাদ অনুসারে একটি নির্দিষ্ট আয়ন একটি নির্দিষ্ট বাহক দ্বারা পরিবাহিত হয়। কোষঝিল্লিতে ATP  থাকে। ATP-ase এনজাইম ATP-কে ভেঙ্গে শক্তি উৎপন্ন করে। এই শক্তির প্রভাবে কোষের ভিতরের তল থেকে প্রোটন (H+) কোষের বাইরের তলে আসে। এই ঘটনাকে প্রোটন পাম্প বলে। এতে কোষের ভিতরের তলে pH বেড়ে যায় এবং বাইরের তলে pH কমে যায়। এই ঘটনাকে pH gradient বলে। একই কারণে কোষের ভিতরের তলে + চার্জ কমে যায় এবং বাইরের তলে+ চার্জ বেড়ে যায়। এই ঘটনাকে Protential gradient বলে। pH gradient I Protential gradient-কে একত্রে Proton Motive Force (PMF) বলে। Proton Motive Force সৃষ্টি হলে কোষের বাইরের তলে বিদ্যমান নিষ্ক্রিয় প্রোটিনগুলো সক্রিয় প্রোটিনে পরিনত হয়। সক্রিয় প্রোটিনগুলো বাহক হিসেবে কাজ করে এবং কোষের বাইরের তল থেকে কোষের ভিতরের তলে ক্যাটায়ন (K+) বহন করে আনে। এতে কোষের ভিতরের তলে ক্যাটায়নের পরিমাণ বেড়ে যায়। এ কারণে কোষের বাইরের তল থেকে প্রোটন (H+) কোষের ভিতরের তলে প্রবেশ করতে চায়। তখন প্রোটন ও অ্যানায়ন সহঅবস্থানের মাধ্যমে কোষের বাইরের তল হতে কোষের ভিতরের তলে প্রবেশ করে। পরে অ্যানায়ন ও ক্যাটায়ন মিলিত হয়ে কোষের খনিজ লবণের চাহিদা পুরণ করে।

প্রোটিন-লেসিথিন তত্ত্ব ।। Protein lesithin theory ।। ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

১৯৫৭ সালে বিজ্ঞানী বেনেট ক্লার্ক (Bennet Clark) প্রোটিন লেসিথিন মতবাদটি প্রবর্তন করেন। এই মতবাদ অনুসারে, লেসিথিন নামক এক ধরনের ফসফোলিপিড বাহক হিসেবে কাজ করে। কোষের বাইরের তলে লেসিথিন অ্যানায়ন ক্যাটায়নের সাথে যুক্ত হয়েআয়ন লেসিথিন কমপ্লেক্সগঠন করে।আয়ন লেসিথিন কমপ্লেক্সকোষের বাইরের তল থেকে ভিতরের তলে আসে। কোষের ভিতরের তলে লেসিথিনেজ এনজাইমের প্রভাবে যৌগটি ভেঙ্গে কোলিন ফসফোটাইডিক এসিড উৎপন্ন হয় এবং ক্যাটায়ন অ্যানায়ন মুক্ত হয়। ATPএর সহায়তায় কোলিন এবং ফসফোটাইডিক এসিড কোষের বাইরের তলে চলে যায় এবং মিলিত হয়ে লেসিথিন গঠন করে। এভাবে লেসিথিনের চক্রাকারে সংশ্লেষণ বিশ্লেষণের মাধ্যমে অ্যানায়ন ক্যাটায়ন শোষিত হয়।

আয়ন বাহক মতবাদ আলোচনা ।। Ion carrier theory ।। ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

১৯৩৭ সালে বিজ্ঞানী ভ্যান্ডেন হোনের্ট (Vanden Honert) আয়ন বাহক মতবাদটি প্রবর্তন করেন। এই মতবাদ অনুসারে, কোষঝিল্লির বাইরে বহিঃতল (outer space) এবং কোষঝিল্লির ভিতরে অন্তঃতল (inner space) থাকে। আয়নগুলো বহিঃতল অন্তঃতলে মুক্ত ভাবে চলাচল করতে পারে, কিন্তু কোষঝিল্লির ভিতরে মুক্ত ভাবে চলাচল করতে পারে না। বাইরের পরিবেশ থেকে আয়নগুলো সরাসরি বহিঃতলে আসে। বহিঃতলে আয়ন বাহক যুক্ত হয়েআয়ন কমপ্লেক্সগঠন করে। আয়ন কমপ্লেক্স যৌগটি কোষঝিল্লির ভিতর দিয়ে অন্তঃতলে পৌছে। অন্তঃতলে পৌছালে আয়ন কমপ্লেক্স যৌগটি ভেঙ্গে যায় এবং আয়ন বাহক মুক্ত হয়ে যায়। মুক্ত আয়নটি কোষের ভিতরে জমা হয়। বাহকটি আগের স্থানে ফিরে যায় এবং আরেকটি আয়ন পরিবহনে অংশ নেয়। এক্ষেত্রে যৌগ সৃষ্টি, চলাচল এবং ভাঙ্গার জন্য বিপাকীয় শক্তি ^সন থেকে আসে।

লুন্ডিগার্ড ।। লুন্ডিগার্ডের মতবাদের সমালোচনা

লুন্ডিগার্ডের মতবাদটি সত্য বলে প্রমাণিত হলেও এ মতবাদের কিছু ক্রুটি রয়েছে। এগুলো হলো-

১। অ্যানায়ন পরিশোষণ সক্রিয় বলা হলেও শক্তি (ATP) ব্যবহার হয় তা দেখানো হয় নাই।

২। সাইটোক্রোমের মধ্য দিয়ে ক্যাটায়নের পরিবহন পরিষ্কার নয়।

৩। সাইটোক্রোমের মধ্য দিয়ে অ্যানায়ন পরিবাহিত হয়, কিন্তু ক্যাটায়ন পরিবাহিত হয় না। এটা অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

৪। এ মতবাদে অ্যানায়ন পরিশোষণের সময় শ্বসন হার বৃদ্ধি পায়, কিন্তু ক্যাটায়ন পরিশোষণের সময় শ্বসন হার বৃদ্ধি পায় না। বিজ্ঞানী ইপস্টেইন (Epstein, 1955) এবং হ্যান্ডি (Handey,1955) তাদের পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণ করেন যে, ক্যাটায়ন পরিশোষণের সময় শ্বসন হার বৃদ্ধি পায়।

লুন্ডিগার্ড । লুন্ডিগার্ডের সাইটোক্রোম পাম্প মতবাদ ।। Lundegarth theory

১৯৩৩ সালে বিজ্ঞানী লুন্ডিগার্ড ও তাঁর সহকর্মী বার্সাট্রম উদ্ভিদের খনিজ লবণ পরিশোষণ সম্পর্কে যে মতবাদ প্রবর্তন করেন তাকে লুন্ডিগার্ডের মতবাদ বলে। এই মতবাদ অনুসারে সাইটোক্রোম নামক লৌহ খনিজ লবণ পরিশোষণে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে বলে একে সাইটোক্রোম পাম্প মতবাদও বলা হয়। তাঁরা লক্ষ্য করেন যে, উদ্ভিদকে পানি থেকে লবণের দ্রবণে রাখলে ঐ উদ্ভিদের শ্বসন হার বৃদ্ধি পায়। তাঁরা এই বর্ধিত শ্বসনকে অ্যানায়ন-শ্বসন বা লবণ-শ্বসন নামে অভিহিত করেন।

লুন্ডিগার্ডের সাইটোক্রোম পাম্প মতবাদ অনুসারে প্রতিটি কোষের দুইটি তল থাকে। বাইরের তল ও ভিতরের তল। কোষের ভিতরের তলে ডিহাইড্রোজিনেজ বিক্রিয়ায় প্রোটন (H+) ও ইলেকট্রন (e) উৎপন্ন হয়। প্রোটন (H+) সরাসরি কোষের বাইরের তলে চলে আসে এবং অক্সিজেনের সাথে মিলিত হয়ে পানি (H2O) উৎপন্ন করে। অপরদিকে, ইলেকট্রন (e) সাইটোক্রোম চেইনে প্রবেশ করে। কোষের ভিতরের তলে সাইটোক্রোম ইলেকট্রন গ্রহণ করে বিজারিত হয়। ইলেকট্রন (e) সাইটোক্রোম চেইনে প্রবেশ করার পর চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে কোষের বাইরের তলে আসে। কোষের বাইরের তলে সাইটোক্রোম ইলেকট্রন ত্যাগ করে জারিত হয়। জারিত সাইটোক্রোম কোষ ঝিল্লিতে অবস্থিত অ্যানায়নের (A) সাথে যুক্ত হয়ে ‘সাইটোক্রোম-অ্যানায়ন’ যৌগ গঠন করে। অ্যানায়ন (A) সাইটোক্রোম চেইনের মাধ্যমে চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে কোষের ভিতরের তলে আসে এবং জমা হতে থাকে। কোষের ভিতরের তলে অ্যানায়নের (A) আধিক্যের কারণে একটি বৈদ্যুতিক-বিভব পার্থক্যের সৃষ্টি হয়। এই বৈদ্যুতিক-বিভব পার্থক্যের সমতা আনার জন্য কোষের বাইরের তল হতে ক্যাটায়ন (K+) সরাসরি কোষের ভিতরের তলে প্রবেশ করে। পরে ক্যাটায়ন ও অ্যানায়ন মিলিত হয়ে কোষের খনিজ লবণের চাহিদা পুরণ করে।

Fe++ (2A) – e + A → Fe+++ (3A)

সক্রিয় পরিশোষণের বৈশিষ্ট্য কী কী ।। ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

১। সক্রিয় পরিশোষণে বিপাকীয় শক্তির প্রত্যক্ষ প্রয়োজন হয়।

২। সক্রিয় পরিশোষণে বাহকের প্রয়োজন হয়।

৩। আয়ন শোষণের সময় শ^সন হার বৃদ্ধি পায়।

৪। আয়ন শোষণে এনজাইম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৫। একই সাথে ক্যাটায়ন ও অ্যানায়ন শোষিত হতে পারে।

৬। ঘনত্বের আনতি-এর বিপরীতে আয়ন শোষিত হতে পারে।

সক্রিয় পরিশোষণ কী ।। Active absorption কী

যে পরিশোষণ প্রক্রিয়ায় বিপাকীয় শক্তির প্রয়োজন হয় তাকে সক্রিয় পরিশোষণ বলে। উদ্ভিদদেহে বেশির ভাগ খনিজ লবণ সক্রিয় ভাবে পরিশোষিত হয়। প্রফেসর হোগল্যান্ড (D.R. Hogland) লক্ষ্য করেন, Nitella শৈবালের কোষের অজৈব উপাদানের ঘনত্ব পানিতে বিদ্যমান অজৈব উপাদানের ঘনত্বের চেয়ে বেশি।