ভাইরাসের গড় ব্যাস 8-300 nm। সাধারণত উদ্ভিদ ভাইরাস 17-2000 nm এবং প্রাণী ভাইরাস 20-350 nm হয়ে থাকে। সবচেয়ে ছোট উদ্ভিদ ভাইরাস হলো স্যাটেলাইট টোবাকো নেক্রোসিস ভাইরাস, ইহা 8-17 nm। সবচেয়ে বড় উদ্ভিদ ভাইরাস হলো সাইট্রাস ট্রিসটেজা ভাইরাস, ইহা 2000×12 nm। সবচেয়ে ছোট প্রাণী ভাইরাস হলো গবাদি পশুর ফুট এন্ড মাউথ রোগের ভাইরাস, ইহা 8-12 nm। সবচেয়ে বড় প্রাণী ভাইরাস হলো গুটি বসন্তের ভিরিওলা ভাইরাস, ইহা 350×250×100 nm। রাইনোভাইরাস 10 nm, পোলিও ভাইরাস 12nm, ফুলকপির মোজাইক ভাইরাস 50 nm, ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস 100 nm, হার্পিস ভাইরাস 100-150 nm, মাম্পস ভাইরাস 150-250 nm, ভ্যাক্সিনিয়া ও ভেরিওলা ভাইরাস 280-300 nm, গবাদি পশুর গো-বসন্ত ভাইরাসের দৈর্ঘ্য 300 nm এর বেশি, টোবাকো মোজাইক ভাইরাস 300×18 nm এবং আলুর X ভাইরাস 500×10nm। বিট ইয়োলো ভাইরাস 1250×40 nm।
ভাইরাসের আবাস (Position of virus)
ভাইরাস জীব ও জড় উভয় পরিবেশে বসবাস করে। উদ্ভিদ, প্রাণী, ব্যাকটেরিয়া, সায়ানোব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, অ্যাকটিনোমাইসিটিস প্রভৃতি জীবদেহে সক্রিয়ভাবে অবস্থান করে। আবার মাটি, পানি, বায়ু ইত্যাদি সর্বত্রই নিষ্ক্রিয়ভাবে অবস্থান করে। উঞ্চ প্রস্রবণ থেকে প্রচন্ড ঠান্ডা পানিতে এদের পাওয়া যায়। ১ চা চামচ সমুদ্রের পানিতে ১ মিলিয়ন ভাইরাস থাকে।
ভাইরোলজি (Virology)
জীববিজ্ঞানের যে শাখায় ভাইরাসের আকার, গঠন, বংশবিস্তার, রোগতত্ত্ব ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করা হয় তাকে ভাইরোলজি (Virology) বলে। স্ট্যানলি (W. M. Stanley)-কে ভাইরোলজির জনক বলা হয়।
ভাইরাসের প্রকৃতি (Nature of virus)
প্রাণ-রসায়ন বিজ্ঞানীদের মতে ভাইরাস হলো জড় পদার্থ। কিন্তু অণুজীব বিজ্ঞানীদের মতে ভাইরাস হলো জীব। ভাইরাসের বৈশিষ্ট্য থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, ভাইরাস জীবও নয় জড়ও নয়। এ কারণে ১৯৫২ সালে বিজ্ঞানী লোফ (A. Lowff) মন্তব্য করেছিলেন- A Virus is a virus. It is neither a living organism nor a non-living chemical, but something between betewixt. অর্থাৎ ভাইরাস ভাইরাসই। এটি জীব বস্তুও নয় আবার জড় রাসায়নিক বস্তুও নয়। ভাইরাস হলো জীব ও জড়ের মধ্যবর্তী এক ধরনের জীবসত্তা।
১৯৬২ সালে বিজ্ঞানী স্ট্যানলি (Stanley) এবং ভ্যালেন (Valens) মন্তব্য করেন, ভাইরাস এমনিতেই জড়বস্তুর ন্যায়, কিন্তু যে মুহুর্তে কোন কোষকে আক্রমণ করার সুযোগ পায় সে মুহুর্তে প্রাণের সঞ্চার হয়।
ভাইরাসের জড় বৈশিষ্ট্য
১। ভাইরাস প্রোটোপ্লাজমবিহীন অকোষীয় উপাদান।
২। ভাইরাস জীবকোষের বাইরে রাসায়নিক কণা বা নির্জীব স্ফটিকের মতো নিস্ক্রিয়।
৩। এরা স্বাধীনভাবে প্রজননক্ষম নয়। জীবকোষের বাইরে সংখ্যা বৃদ্ধি করতে পারে না।
৪। এদেরকে কেলাসিত, সেন্ট্রিফিউজ, ব্যাপন এবং সাসপেনশন করা যায়।
৫। এদের কোষ প্রাচীর, প্লাজমাপর্দা, মাইটোকন্ড্রিয়া, লাইসোসোম, রাইবোসোম প্রভৃতি নাই।
৬। ভাইরাসের দৈহিক বৃদ্ধি ঘটে না।
৭। পরিবেশীয় কোন উদ্দীপনায় এরা সাড়া দেয় না।
৮। শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়া– সালোকসংশ্লেষণ, শ্বসন, চলন, বৃদ্ধি, অভিস্রবণ প্রভৃতি ঘটে না।
৯। এদের বিপাকীয় এনজাইম নাই এবং পুষ্টি ক্রিয়া ঘটে না।
১০। অ্যান্টিবায়োটিক ভাইরাসের দেহে কোন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে না।
১১। ভাইরাস এসিড, ক্ষার ও লবণকে প্রতিরোধ করতে পারে।
১২। এদের শক্তি উৎপাদনকারী কোন তন্ত্র নাই।
১৩। এরা আয়তনে বৃদ্ধি পায় না এবং বাহ্যিক কোন উদ্দীপনায় সাড়া দেয় না।
১৪। অ্যান্টিবায়োটিক দ্বারা এদের নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
ভাইরাসের জীবীয় বৈশিষ্ট্য
১। ভাইরাস নিউক্লিক এসিড এবং প্রোটিন দ্বারা গঠিত।
২। এরা জীবকোষের ভিতরে সংখ্যা বৃদ্ধি করতে পারে।
৩। এতে জেনেটিক রিকম্বিনেশন (genetic recombination) ঘটতে দেখা যায়।
৪। এদের প্রকরণ (variation) ও মিউটেশন (mutation) ঘটে এবং নতুন ষ্ট্রেইন সৃষ্টি হয়।
৫। ভাইরাস পোষক দেহে রোগ সৃষ্টি করতে পারে।
৬। এরা সুনির্দিষ্ট ভাবে বাধ্যতামুলক পরজীবী।
৭। সৃষ্ট নতুন ভাইরাসে মূল ভাইরাসের বৈশিষ্ট্য বজায় থাকে।
৮। এদের অভিযোজন (adaptation) ক্ষমতা অসাধারণ।
৯। এদের প্রোটিন আবরণীটি অ্যান্টিজেনিক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন।
১০। ভাইরাস তার অনুরুপ ভাইরাস জন্ম দিতে পারে।
১১। ভাইরাস নির্দিষ্ট বংশধারা বজায় রাখতে সক্ষম।
১২। ভাইরাস প্রোটিন সংশ্লেষণ করতে পারে।
১৩। পোষক কোষের নিউক্লিয়াস বা জেনেটিক বস্তু জোরপূর্বক ব্যবহার করে এদের বহুবিভাজন ঘটে।
১৪। এরা সুনির্দিষ্ট অঙ্গ বা জীবের উপর ক্রিয়া করে।
১৫। ভাইরাসে লাইসোজাইম এনজাইম থাকে।
ভাইরাসের আবিষ্কার (Discovery of virus)
১। ১৫৭৬ সালে চার্লস এনক্লুজ (Charles Encluse) সর্বপ্রথম ভাইরাসের অস্তিত্ব অনুধাবন করেন।
২। ১৭৯৬ সালে বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড জেনার (Edward Jenner) ভাইরাসঘটিত বসন্ত রোগের কথা উল্লেখ করেন।
৩। ১৮৮৬ সালে হল্যান্ডের বিজ্ঞানী অ্যাডলফ মায়ার (Adolf Mayer) সর্বপ্রথম তামাক পাতার ছোপ ছোপ মোজাইক রোগ দেখতে পান।
৪। ১৮৯২ সালে রাশিয়ান বিজ্ঞানী দিমিত্রি আইভানোভস্কি (Dmitri Ivanovsky) প্রমাণ করেন তামাক পাতার জীবাণু ব্যাকটেরিয়ারোধক ফিল্টার দ্বারা ফিল্টার করা যায় এবং উক্ত জীবাণু ব্যাকটেরিয়ার চেয়ে ক্ষুদ্র। তিনি একে Virum নামে অভিহিত করেন। তাই আইভানোভস্কিকে ভাইরাসের আবিষ্কারক বলা হয়।
৫। ১৮৯৮ সালে বিজ্ঞানী মার্টিনাস বেইজেরিংক (Martinus Beijerinck) তামাক পাতার জীবাণুর নামকরণ করেন টোবাকো মোজাইক ভাইরাস (TMV)।
৬। ১৯০১ সালে বিজ্ঞানী ওয়াল্টার রিড (Walter Reed) সর্বপ্রথম মানুষের পীতজ্বর বা জন্ডিস রোগ সৃষ্টিকারী ভাইরাস আবিষ্কার করেন।
৭। ১৯৩১ সালে জার্মান প্রকৌশলী আর্নেস্ট রুস্কা (Ernst Ruska) এবং ম্যাক্স নোল (Max Knoll) সর্বপ্রথম ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে ভাইরাসের চিত্র গ্রহণ করেন।
৮। ১৯৩৫ সালে আমেরিকান বিজ্ঞানী স্ট্যানলি (Wendel Meredith Stanley) তামাকের TMV-কে পৃথক করে কেলাসিত করেন। এ জন্য তিনি ১৯৪৬ সালে নোবেল পুরুষ্কার লাভ করেন। স্ট্যানলি এক টন তামাক পাতা থেকে মাত্র এক চা চামচ পরিমাণ ভাইরাস কৃস্টাল পৃথক করেন।
৯। ১৯৩৬-১৯৩৭ সালে বিজ্ঞানী বাউডেন (F. C. Bawden) এবং পিরি (N. W. Pirie) প্রমাণ করেন যে, ভাইরাস নিউক্লিক এসিড ও প্রোটিন দ্বারা গঠিত।
১০। ১৯৪১ সালে বার্নাল ও ফাঙ্কুচেন কেলাসিত ভাইরাসে এক্স-রে অপবর্তন চিত্র গ্রহণ করেন। এই চিত্রের ভিত্তিতে ১৯৫৫ সালে রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন ভাইরাসের পূর্ণাঙ্গ গঠন আবিষ্কার করেন।
১১। ১৯৫১ সালে শেফারম্যান (R. S. Shafferman) ও মরিস (M. E. Morris) সায়ানোব্যাকটেরিয়া ধ্বংসকারী সায়ানোফাজ আবিষ্কার করেন।
১২। ১৯৫২ সালে বিজ্ঞানী A. Lwoff বলেছিলেন- A Virus is a virus. It is neither a living organism nor a non-living chemical, but something between. অর্থাৎ ভাইরাস ভাইরাসই। এটি জীব বস্তুও নয় আবার জড় রাসায়নিক বস্তুও নয়। ভাইরাস হলো জীব ও জড়ের মধ্যবর্তী এক ধরনের জীবসত্তা।
১৩। ১৯৬৩ সালে বিজ্ঞানী বারুচ ব্লুমবার্গ (Baruch Blumberg) হেপাটাইটিস-বি আবিষ্কার করেন।
১৪। ১৯৬৫ সালে বিজ্ঞানী হাওয়ার্ড টামিন (Howard Temin) রেট্রোভাইরাস আবিষ্কার করেন।
১৫। ১৯৮৪ সালে বিজ্ঞানী গ্যালো (Gallow) মানুষের মরণব্যাধি এইডস রোগের জীবাণু HIV আবিষ্কার করেন। পরে ধারাবাহিক ভাবে বিজ্ঞানী গ্যালো, সিনৌসি ও মন্টেনিয়ার HIV-এর দুটি টাইপ আবিষ্কার করেন।
১৬। ১৯৮৯ সালে বিজ্ঞানী অল্টার (Hervey J. Alter) নীরব ঘাতক হেপাটাইটিস সি আবিষ্কার করেন।
১৭। ২০১৯ সালের শেষের দিকে নভেল করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯ আবিষ্কৃত হয়।
ভাইরাস (Virus) কী
Virus অর্থ Virum বা বিষ। Virum থেকে Virus শব্দটি নেয়া হয়েছে। নিউক্লিক এসিড ও প্রোটিন দ্বারা গঠিত অতিআণুবীক্ষণিক অকোষীয় জীবাণু যা জীবকোষের ভিতরে সংখ্যা বৃদ্ধি ও রোগ সৃষ্টি করে, কিন্তু জীবকোষের বাইরে জড় পদার্থের ন্যায় আচরণ করে তাকে ভাইরাস (Virus) বলে। প্রাচীনকালে রোগ সৃষ্টিকারী যে কোন বিষাক্ত পদার্থকে ভাইরাস বলা হতো।
ভাইরাসের সংজ্ঞা (Defination of virus)
১। বিখ্যাত বিজ্ঞানী প্লেকজার (Pleczar)-এর মতে, যে সকল অকোষীয় অতি আণুবীক্ষণিক সংক্রামক সত্তা প্রোটিন ও নিউক্লিক এসিড দ্বারা গঠিত এবং শুধুমাত্র জীবন্ত পোষক কোষে সংখ্যা বৃদ্ধি করতে পারে তাকে ভাইরাস বলে।
২। বিজ্ঞানী বাউডেন (Bawden, 1947)-এর মতে, ভাইরাস হলো খালি চোখে অদৃশ্য বাধ্যতামূলক পরজীবী।
৩। বিজ্ঞানী লোফ (A. Lwoff, 1952)-এর মতে, ভাইরাস হলো ভাইরাস (Virus is a virus)।
৪। বিজ্ঞানী জর্জ (George, 1983)-এর মতে, নিউক্লিওপ্রোটিনযুক্ত কেন্দ্রীয় অংশ এবং প্রোটিন আবরণী দ্বারা গঠিত অতি আণুবীক্ষণিক ক্ষতিকর বস্তু, যা উদ্ভিদ ও প্রাণীদেহে রোগ সৃষ্টি করে তাই ভাইরাস।
অণুজীব ।। Microbe
যে সব জীব খুবই ক্ষুদ্র এবং ইলেকট্রন অণুবীক্ষণযন্ত্র ছাড়া দেখা যায় না তাদেরকে অণুজীব বা Microbe বলে। জীববিজ্ঞানের যে শাখায় অণুজীব নিয়ে আলোচনা করা হয় তাকে অণুজীববিজ্ঞান বা মাইক্রোবায়োলজি বলে। অ্যান্টনি ভন লিউয়েন হুক(Antonie Van Leeuwenhoek)-কে মাইক্রোবায়োলজির জনক বলা হয়। ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, মাইক্রোপ্লাজমা, অ্যাকটিনোমাইসিটিস, সায়ানোব্যাকটেরিয়া প্রভৃতি হলো অণুজীব।