রেপ্লিসোম কী । রেপ্লিকেশন কমপ্লেক্স কী । Replication complex । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

DNA রেপ্লিকেশনের সময় রেপ্লিকেশন ফর্কের নিকট কিছু এনজাইম ও প্রোটিন যুক্ত হয়ে জটিল আণবিক গঠন সৃষ্টি করে। একে রেপ্লিসোম বা রেপ্লিকেশন কমপ্লেক্স বলে।

DNA রেপ্লিকেশনের ধাপসমুহ বর্ণনা । Steps of DNA replication । প্রতিলিপনের ধাপসমুহ বর্ণনা । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

DNA রেপ্লিকেশন হলো জীবজগতের সবচেয়ে মঙ্গলজনক পদ্ধতি। প্রকৃত কোষের রেপ্লিকেশন একটি জটিল প্রক্রিয়া। প্রক্রিয়াটি তিনটি শিরোনামে আলোচনা করা যায়। ডবল হেলিক্স পৃথকীকরণ, সম্পূরক শিকল সৃষ্টি এবং নতুন DNA সৃষ্টি।

১। ডবল হেলিক্সকে পৃথকীকরণ

(i) রেপ্লিকেশনের শুরুতে DNA-এর সুনির্দিষ্ট স্থানে ক্ষারক জোড় মুক্ত হয়ে যায় এবং বুদবুদের ন্যায় ori বিন্দু বা রেপ্লিকন বিন্দু বা সূচনা বিন্দু সৃষ্টি হয়। সাধারণত DNA-এর যে স্থানে অ্যাডিনিন ও থাইমিন বেশি থাকে সেখানে ওরি বিন্দু সৃষ্টি হয়। কারণ অ্যাডিনিন ও থাইমিনে দুইটি হাইড্রোজেন (A=T) বন্ধনী থাকে। আদিকোষে একটি এবং প্রকৃতকোষে একাধিক ওরি বিন্দু থাকে।

(ii) প্রথমে হেলিকেজ এনজাইম Ori বিন্দুতে যুক্ত হয় এবং ডবল হেলিক্সের প্যাঁচ খুলতে শুরু করে। এরপর হেলিকেজ এনজাইম ATP থেকে শক্তি নিয়ে হাইড্রোজেন বন্ধনী ভেঙ্গে দেয়। সূত্র দুটি পৃথক হয়ে যাওয়া স্থানে Y আকৃতির গঠন সৃষ্টি হয়। একে রেপ্লিকেশন ফর্ক (Replication fork) বলে।

(iii) প্যাঁচ খোলার পর টান বা আকর্ষণজনিত কারণে পৃথক হওয়া সূত্র দুটি পুনরায় প্যাঁচ পাকিয়ে জড়ো হতে চায়। টপোআইসোমারেজ এনজাইম রেপ্লিকেশন ফর্ক-এর কাছাকছি স্থানে সূত্রটি কেটে দেয়। ফলে সূত্রটির প্যাঁচ তৈরী ও জড়ো হওয়ার আকর্ষণজনিত টান নষ্ট হয়ে যায়। আদিকোষে গাইরেজ এনজাইম সূত্রের প্যাঁচ তৈরী ও জড়ো হওয়ার আকর্ষণজনিত টান নষ্ট করে দেয়। পরবর্তীতে কেটে দেওয়া সূত্রটি পুনরায় জোড়া লাগানো হয়।

(iv) সূত্র দু’টির একটি অপরটির পরিপূরক। তাই হাইড্রোজেন বন্ধনী সৃষ্টি করে পুনরায় সংযুক্ত হতে চায়। Single Strand Binding Protein (SSBP) হাইড্রোজেন বন্ধনী সৃষ্টি হতে দেয় না। ফলে সূত্র দুটি পুনরায় যুক্ত হতে পারে না।

(v) রেপ্লিকেশন ফর্ক দুটি বিপরীত দিকে অগ্রসর হয় এবং মাঝখানের ফাঁকা স্থানে বেলুন বা চোখের মতো গঠন সৃষ্টি হয়। একে রেপ্লিকেশন আই (Replication eye) বা রেপ্লিকেশন বাবল (Replication bubble) বলে। একই সাথে অনেকগুলো রেপ্লিকেশন বাবল তৈরী হয়। বাবলগুলো লম্বা হতে থাকে এবং মিলিত হয়ে সূত্র দুটিকে পৃথক করে। DNA এর সূত্র দুটি পৃথক হয়ে যাওয়াকে পৃথকীভবন বা ডিন্যাচুরেশন বলে।

২। সম্পূরক শিকল সৃষ্টি

(i) RNA প্রাইমেজ এনজাইম সূত্র দুটিকে ছাঁচ হিসেবে ব্যবহার করে এবং ক্ষুদ্র প্রাইমার সৃষ্টি করে। প্রাইমারের ৩ প্রান্তে মুক্ত -OH গ্রুপ থাকে।

(ii) DNA পলিমারেজ এনজাইম প্রাইমারের ৩- OH প্রান্তে নতুন নতুন নিউক্লিওটাইড যুক্ত করে। নিউক্লিওটাইড গুলো ৫-৩ কার্বনমুখী যুক্ত হতে থাকে। ফলে দুইটি নতুন সূত্র সৃষ্টি হতে থাকে। একটি লিডিং (অগ্রগামী) সূত্র এবং অপরটি ল্যাগিং (ধীরগামী) সূত্র।

(iii) যে সূত্রটি রেপ্লিকেশন ফর্ক-এর দিকে বৃদ্ধি পায় তাকে লিডিং সূত্র বলে। লিডিং সূত্র নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে প্রতিরুপ সৃষ্টি করে। যে সূত্রটি রেপ্লিকেশন ফর্ক-এর বিপরীত দিকে বৃদ্ধি পায় তাকে ল্যাগিং সূত্র বলে। ল্যাগিং সূত্র জোড়াবিহীন খন্ড খন্ড ভাবে প্রতিরুপ সৃষ্টি করে।

(iv) ল্যাগিং সূত্রের প্রতিটি খন্ডকে ওকাজাকি (Okazaki) বলে। আদিকোষের ওকাজাকি ১০০০-২০০০টি নিউক্লিওটাইড এবং প্রকৃত কোষের ওকাজাকি ১০০-২০০টি নিউক্লিওটাইড দ্বারা গঠিত। জাপানি বিজ্ঞানী রেইজি ওকাজাকি এবং তাঁর স্ত্রী সুনেকো ওকাজাকি ইহা আবিষ্কার করেন।

৩। নতুন DNA সৃষ্টি

(i) এক্সোনিউক্লিয়েজ এনজাইম নতুন সূত্রের সম্পূরক প্রাইমারগুলোকে অপসারিত করে এবং ঐ খালি স্থানগুলো সম্পূরক নিউক্লিওটাইড দ্বারা পূর্ণ হয়।

(ii) নিউক্লিয়েজ এনজাইম দ্বারা ভুল নিউক্লিওটাইড অপসারিত হয় এবং DNA পলিমারেজ এনজাইম দ্বারা সঠিক নিউক্লিওটাইড সংযুক্ত হয়। এই Mismatch repair (MMR)-কে DNA প্রুফ রিডিং বলা হয়। মানুষের প্রতি ১০০০ জিনের মধ্যে মাত্র একটি মিসম্যাচ হতে পারে।

(iii) লাইগেজ এনজাইম ওকাজাকিগুলোকে যুক্ত করে দেয়। পিউরিন এবং পাইরিমিডিন ক্ষারকগুলো হাইড্রোজেন বন্ধনী দ্বারা সংযুক্ত হয়ে যায়। ফলে দুইটি নতুন DNA সৃষ্টি হয়।

DNA রেপ্লিকেশনের সময় । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

কোষচক্রের ইন্টারফেজ দশা বা S দশায় এবং লেপ্টোটিন উপপর্যায়ে রেপ্লিকেশন ঘটে। আদি কোষে বৃত্তাকার DNA থাকে এবং এর কোন প্রান্ত বা মাঝ নাই। আদিকোষে যেকোন স্থানে রেপ্লিকেশন শুরু হয় এবং রেপ্লিকেশন ফর্ক দুই দিকে সরে গিয়ে মাঝামাঝি স্থানে মিলিত হয়। বৃত্তাকার DNA-এর রেপ্লিকেশন দ্রুত হয় এবং প্রতি মিনিটে দশ লক্ষ পর্যন্ত বেসপেয়ার যুক্ত হতে পারে। প্রকৃতকোষের সূত্রাকার DNA-এর দুইটি প্রান্ত থাকে এবং সূত্রের মাঝখানে বহু স্থানে রেপ্লিকেশন শুরু হয়। সূত্রাকার DNA-এর রেপ্লিকেশন ধীরগতির হয় এবং প্রতি মিনিটে ৫০০-৫০০০ পর্যন্ত বেসপেয়ার যুক্ত হতে পারে। E. coli এর রেপ্লিকেশনে সময় লাগে ২০-৩০ মিনিট। প্রাণীকোষে রেপ্লিকেশনে সময় লাগে ১.৪-২৪ ঘন্টা। ডসোফিলাতে ৫০,০০০ জায়গায় রেপ্লিকেশন শুরু হতে পারে।

মেসেলসন-স্টাহল এর পরীক্ষা। Meselson-Stahl । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

মেসেলসন এবং স্টাহল (১৯৫৮) ) E. coli ব্যাকটেরিয়াকে 14N এবং 15N এর একটি ভারী আইসোটোপ সমৃদ্ধ কালচার মিডিয়ামে জন্মানোর ব্যবস্থা করেন। কয়েক জেনারেশন পর E. coli ব্যাকটেরিয়ার DNA-কে 15N দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। এরপর 15N  সমৃদ্ধ ব্যাকটেরিয়াকে পুনরায় 14N মিডিয়ামে স্থানান্তর করা হয়। পরবর্তী জেনারেশনে দেখা গেল, নতুন সৃষ্ট ব্যাকটেরিয়ার DNA-এর ডবল হেলিক্সের একটি সূত্র 14N এবং অপর সূত্রটি 15N বিশিষ্ট। অর্থাৎ ডবল হেলিক্সের একটি পুরাতন সূত্র এবং অপরটি নতুন সূত্র। এতে প্রমাণিত হয় যে, DNA-এর রেপ্লিকেশন অর্ধ-সংরক্ষণশীল পদ্ধতিতে ঘটে।

DNA এর রেপ্লিকেশন কী । DNA এর রেপ্লিকেশন এর প্রকারভেদ । Replication of DNA । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

যে প্রক্রিয়ায় একটি ডবল হেলিক্স DNA হতে হুবহু একই প্রকৃতির দু’টি নতুন DNA তৈরী হয় তাকে DNA রেপ্লিকেশন বা প্রতিলিপন বলে। ব্যাকটেরিয়ার বৃত্তাকার DNA অণুতে প্রতিলিপনে মিনিটে ১০ লক্ষ বেসপেয়ার যুক্ত হতে পারে। প্রকৃত কোষের লম্বা উঘঅ অণুতে প্রতিলিপনে মিনিটে ৫০০-৫০০০ বেসপেয়ার যুক্ত হতে পারে। প্রকৃত কোষের DNA এর কোন প্রান্তেই অনুলিপন শুরু হয় না।
১৯৫৬ সালে লেভিয়েন্থান এবং ক্রেন DNA অণুর রেপ্লিকেশন সম্পর্কে তিনটি অনুকল্প প্রস্তাব করেন। এগুলো হলো-সংরক্ষণশীল প্রক্রিয়া, বিচ্ছুরণশীল প্রক্রিয়া ও অর্ধসংরক্ষণশীল প্রক্রিয়া।
১। সংরক্ষণশীল প্রক্রিয়া (Conservative hypothesis)ঃ সংরক্ষণশীল প্রক্রিয়ায় DNA এর সূত্র দু’টি পৃথক হয়ে যায়। প্রতিটি সূত্র ছাঁচ হিসেবে কাজ করে এবং নতুন সূত্র সৃষ্টি করে। এরপর পুরাতন সূত্র দু’টি একত্রে এবং নতুন সূত্র দু’টি একত্রে অবস্থান করে। ফলে দুইটি DNA সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ একটি DNA এর দু’টি সূত্রই পুরাতন এবং অপর DNA এর দু’টি সূত্রই নতুন।
২। বিচ্ছুরণশীল প্রক্রিয়া (Dispersive hypothesis)ঃ বিচ্ছুরণশীল প্রক্রিয়ায় DNA এর সূত্র দু’টি খন্ডিত হয়ে যায়। এরপর বিভিন্ন পরিমাণে পুরাতন ও নতুন খন্ডক গুলো সংযুক্ত হয়ে দু’টি DNA অণু সৃষ্টি করে। এই প্রক্রিয়াটি গ্রহণযোগ্য নয়।
৩। অর্ধসংরক্ষণশীল প্রক্রিয়া (Semiconservative hypothesis)ঃ যে প্রক্রিয়ায় একটি মাতৃ DNA থেকে দুইটি নতুন DNA সৃষ্টি হয় এবং নতুন DNA দু’টির প্রত্যেকটিতে একটি মাতৃসূত্র এবং একটি নতুন সূত্র থাকে তাকে অর্ধসংরক্ষণশীল প্রক্রিয়া বলে। ১৯৫৭ সালে বিজ্ঞানী স্টেন্ট সর্বপ্রথম অর্ধসংরক্ষণশীল শব্দটি ব্যবহার করেন। ১৯৫৮ সালে মেসেলসন-স্টাহল (Mathew Meselson & Franklin Stahl) E. coli ব্যাকটেরিয়াতে অর্ধসংরক্ষণশীল অনুকল্পটি প্রমাণ করেন। ১৯৬০ সালে হার্বাট টেইলর (Herbert Taylor) শিম গাছের মূলের কোষ পরীক্ষা করে অর্ধসংরক্ষণশীল রেপ্লিকেশন প্রমাণ করেন। ১৯৬০ সালে বিজ্ঞানী সুয়েকা মানব হেলা কোষে অর্ধসংরক্ষণশীল প্রক্রিয়া প্রমাণ করেন। ১৯৬১ সালে বিজ্ঞানী সাইমন (Symon) Chlamydomonas শৈবালে অর্ধসংরক্ষণশীল প্রক্রিয়া প্রমাণ করেন।

অর্ধসংরক্ষণশীল প্রক্রিয়া কী । Semiconservative hypothesis । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

যে প্রক্রিয়ায় একটি মাতৃ DNA থেকে দুইটি নতুন DNA সৃষ্টি হয় এবং নতুন DNA দু’টির প্রত্যেকটিতে একটি মাতৃসূত্র এবং একটি নতুন সূত্র থাকে তাকে অর্ধসংরক্ষণশীল প্রক্রিয়া বলে। ১৯৫৭ সালে বিজ্ঞানী স্টেন্ট সর্বপ্রথম অর্ধসংরক্ষণশীল শব্দটি ব্যবহার করেন। ১৯৫৮ সালে মেসেলসন-স্টাহল (Mathew Meselson & Franklin Stahl) E. coli ব্যাকটেরিয়াতে অর্ধসংরক্ষণশীল অনুকল্পটি প্রমাণ করেন। ১৯৬০ সালে হার্বাট টেইলর (Herbert Taylor) শিম গাছের মূলের কোষ পরীক্ষা করে অর্ধসংরক্ষণশীল রেপ্লিকেশন প্রমাণ করেন। ১৯৬০ সালে বিজ্ঞানী সুয়েকা মানব হেলা কোষে অর্ধসংরক্ষণশীল প্রক্রিয়া প্রমাণ করেন। ১৯৬১ সালে বিজ্ঞানী সাইমন (Symon) Chlamydomonas শৈবালে অর্ধসংরক্ষণশীল প্রক্রিয়া প্রমাণ করেন।

বিচ্ছুরণশীল প্রক্রিয়া কী । Dispersive hypothesis কী । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

বিচ্ছুরণশীল প্রক্রিয়ায় DNA এর সূত্র দু’টি খন্ডিত হয়ে যায়। এরপর বিভিন্ন পরিমাণে পুরাতন ও নতুন খন্ডক গুলো সংযুক্ত হয়ে দু’টি DNA অণু সৃষ্টি করে। এই প্রক্রিয়াটি গ্রহণযোগ্য নয়।

সংরক্ষণশীল প্রক্রিয়া কী । Conservative hypothesis কী । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

সংরক্ষণশীল প্রক্রিয়ায় DNA এর সূত্র দু’টি পৃথক হয়ে যায়। প্রতিটি সূত্র ছাঁচ হিসেবে কাজ করে এবং নতুন সূত্র সৃষ্টি করে। এরপর পুরাতন সূত্র দু’টি একত্রে এবং নতুন সূত্র দু’টি একত্রে অবস্থান করে। ফলে দুইটি DNA সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ একটি DNA এর দু’টি সূত্রই পুরাতন এবং অপর DNA এর দু’টি সূত্রই নতুন।

সংরক্ষণশীল প্রক্রিয়ায় DNA এর সূত্র দু’টি পৃথক হয়ে যায়। প্রতিটি সূত্র ছাঁচ হিসেবে কাজ করে এবং নতুন সূত্র সৃষ্টি করে। এরপর পুরাতন সূত্র দু’টি একত্রে এবং নতুন সূত্র দু’টি একত্রে অবস্থান করে। ফলে দুইটি DNA সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ একটি DNA এর দু’টি সূত্রই পুরাতন এবং অপর DNA এর দু’টি সূত্রই নতুন।