হৃৎপিন্ডের মাধ্যমে রক্ত সংবহন । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

হৃৎপিন্ড হলো রক্ত সংবহনের গ্রাহক ও প্রেরণ কেন্দ্র। ইহা প্রতিদিন ২,০০০ গ্যালন রক্ত পাম্প করে এবং ১,০০,০০০ বার সংকুচিত ও প্রসারিত হয়। স্তন্যপায়ী ও পাখির হৃৎপিন্ডে রক্তের দ্বি-বর্তনী সংবহন ঘটে। রক্ত সমগ্র দেহে একবার চক্র সম্পন্ন করার পূর্বে হৃৎপিন্ডের মধ্যে দুই বার প্রবাহিত হওয়াকে দ্বি-বর্তনী সংবহনতন্ত্র বলে। হৃৎপিন্ডের রক্ত সংবহন প্রক্রিয়া হলো-

উদ্দীপকের স্তন্যপায়ীর রক্ত সংবহন প্রক্রিয়া ছকের সাহায্যে দেখানো হলো।

১। উর্ধ্ব ও নিম্ন মহাশিরা দিয়ে CO2 যুক্ত রক্ত ডান অলিন্দে প্রবেশ করে। একই সময়ে ফুসফুসীয় শিরা দিয়ে O2 যুক্ত রক্ত বাম অলিন্দে প্রবেশ করে।

২। অলিন্দ দুটি একই সময়ে সংকুচিত হয় এবং রক্তচাপ বেড়ে যায়। ফলে রক্ত ট্রাইকাসপিড কপাটিকা দিয়ে ডান নিলয়ে এবং বাইকাসপিড কপাটিকা দিয়ে বাম নিলয়ে প্রবেশ করে।

৩। নিলয়দ্বয় রক্ত পূর্ণ হলে সংকুচিত হয় এবং রক্তচাপ বেড়ে যায়। ফলে রক্ত সেমিলুনার কপাটিকা দিয়ে ডান নিলয় থেকে ফুসফুসীয় ধমনীতে এবং বাম নিলয় থেকে মহাধমনীতে প্রবেশ করে।

৪। ফুসফুসীয় ধমনী দিয়ে CO2 যুক্ত রক্ত ফুসফুসে গিয়ে বিশুদ্ধ হয়ে O2 সমৃদ্ধ হয় এবং ফুসফুসীয় শিরার মধ্য দিয়ে বাম অলিন্দে প্রবেশ করে।

৫। মহাধমনী হতে O2 যুক্ত রক্ত দেহের বিভিন্ন অংশে পৌছে যায়।

পারকিনজি তন্তু কী । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

বান্ডল অব হিজের শেষ প্রান্ত সুক্ষ্ম তন্তুতে পরিনত হয় এবং নিলয়ের প্রাচীরে জালক সৃষ্টি করে। একে পারকিনজি তন্তু বলে। ইহা বিশেষায়িত হৃৎপেশি দ্বারা গঠিত এবং দ্রুত ও কার্যকরভাবে হৃদক্রিয়া পরিবাহিত করে। এর গতি প্রতি মিনিটে ৪০-৬০ বার। ইহা নিলয়ের প্রাচীরের সংকোচন ঘটায়। জন ইভানজেলিস্ট পারকিনজি (১৮৩৯) এটি আবিষ্কার করেন।

বান্ডল অব হিজ কী । Bundle of His কী। ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

AVN এর পিছনে বান্ডল অব হিজ অবস্থিত। ইহা বহুমাত্রিক ক্ষুদ্র ফসিকল দ্বারা গঠিত। এর দুইটি শাখার মধ্যে একটি বাম নিলয় এবং অপরটি ডান নিলয়ের প্রাচীর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। সুইস কার্ডিওলজিস্ট উইলহেলম হিজ (১৮৯৩) এটি আবিষ্কার করেন।

অ্যাট্রিও ভেন্ট্রিকুলার নোড কী । AVN কী । সংরক্ষিত পেসমেকার কাকে বলে । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

হৃৎপিন্ডের ডান অলিন্দ-নিলয়ের মধ্যবর্তী পর্দায় AVN অবস্থিত। ইহা হৃৎপেশি দ্বারা গঠিত। একে সংরক্ষিত পেসমেকার বলা হয়। কারণ SAN যদি বৈদ্যুতিক সংকেত সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয় তাহলে উহা সৃষ্টি করে। এটি SAN থেকে উদ্দীপনা গ্রহণ করে বান্ডল অব হিজ-এ সঞ্চারিত করে। SAN থেকে উদ্দীপনা AVN পৌছাতে ০.০৩ সেকেন্ড সময় লাগে। কিন্তু AVN-এ উদ্দীপনা  আসতে ০.০৯ সেকেন্ড বিলম্ব হয়। একে AV Nodal Delay বলে। এরপর AVN ঠঘ থেকে ভেন্ট্রিকলের পেশিতে পৌছাতে আরও ০.০৪ সেকেন্ড সময় লাগে। অর্থাৎ AVN থেকে উদ্দীপনা ভেন্ট্রিকলের পেশিতে পৌছাতে মোট (০.০৩+০.০৯+০.০৪) ০.১৬ সেকেন্ড সময় লাগে।

সাইনো-অ্যাট্রিয়াম নোড কী । SAN কী। পেসমেকার কী । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

উর্ধ্ব মহাশিরা বা সুপিরিয়র ভেনাক্যাভা ও ডান অলিন্দের মাঝখানে একগুচ্ছ বিশেষায়িত হৃৎপেশি থাকে। একে SAN বলে। এর দৈর্ঘ্য ১০-১৫ mm, প্রস্থ ৩ mm এবং পুরু ১ mm। SAN থেকে হৃৎপিন্ডের সংকোচন-প্রসারণের উদ্দীপনা বা অ্যাকশন পোটেনসিয়াল সৃষ্টি হয়। তাই SA নোডকে প্রাথমিক গতির উৎপাদক বলা হয়। উত্তেজনার ঢেউ সৃষ্টি এবং ঢেউ সৃষ্টির উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে বলে SAN-কে পেসমেকার বলা হয়। ইহা প্রতি মিনিটে ১০০ বিট হৃদস্পন্দন ঘটায়। দেহ হতে হৃৎপিন্ড বিচ্ছিন্ন করা হলেও এর সঙ্কোচন চলতে থাকে। এর কার্যকারীতা কমে গেলে ক্লান্তি ও শ্বাসকষ্ট হয়। একে ইশকেমিয়া বলে। মার্টিন ফ্লাক (১৯০৭) এটি আবিষ্কার করেন।

হৃৎপিন্ডের কপাটিকা । হৃৎপিন্ডের ভালভ । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

(i) দ্বিপত্রী বা বাইকাসপিড কপাটিকাঃ বাম অলিন্দ ও নিলয়ের মাঝখানে বাইকাসপিড কপাটিকা অবস্থিত। একে মিট্রাল কপাটিকা বলা হয়। ইহা কর্ডা টেন্ডনি তন্তু দ্বারা কলামনি কর্নির সাথে যুক্ত থাকে। এর আয়তন ৪-৬ বর্গসেমি। ইহা O2 যুক্ত রক্তকে বাম অলিন্দ হতে বাম নিলয়ে আসতে দেয়।

(ii) ত্রিপত্রী বা ট্রাইকাসপিড কপাটিকাঃ ডান অলিন্দ ও নিলয়ের মাঝখানে ট্রাইকাসপিড কপাটিকা অবস্থিত। ইহা কর্ডা টেন্ডনি তন্তু দ্বারা কলামনি কর্নির সাথে যুক্ত থাকে। এর আয়তন ৭-৯ বর্গ সেমি। ইহা CO2 যুক্ত রক্তকে ডান অলিন্দ হতে ডান নিলয়ে আসতে দেয়।

(iii) পালমোনারী সেমিলুনার কপাটিকাঃ ডান নিলয় ও পালমোনারী ধমনীর মাঝখানে যে অর্ধচন্দ্রাকৃতির কপাটিকা থাকে তাকে পালমোনারী সেমিলুনার কপাটিকা বলে। ইহা ত্রি-পর্দা বিশিষ্ট। তবে দ্বি-পর্দা বিশিষ্ট (১-২) হতে পারে। এই কপাটিকার মাধ্যমে CO2 যুক্ত রক্ত ডান নিলয় থেকে পালমোনারী ধমনীতে প্রবেশ করে।

(iv) অ্যাওর্টিক সেমিলুনার কপাটিকাঃ বাম নিলয় ও অ্যাওর্টিক ধমনীর মাঝখানে যে অর্ধচন্দ্রাকৃতির কপাটিকা থাকে তাকে অ্যাওর্টিক সেমিলুনার কপাটিকা বলে। ইহা ত্রি-পর্দা বিশিষ্ট। এই কপাটিকার মাধ্যমে O2 যুক্ত রক্ত বাম নিলয় থেকে অ্যাওর্টিক ধমনীতে প্রবেশ করে।

(v) করোনারি বা থিবোসিয়ান কপাটিকাঃ করোনারী সাইনাস এবং ডান অলিন্দের মাঝখানে থিবেসিয়ান কপাটিকা থাকে। এটি ভ্রুণীয় সাইনো-অ্যাট্রিয়াল কপাটিকার ক্ষয়প্রাপ্ত অংশ। অনেকক্ষেত্রে ইহা অনুপস্থিত থাকে।

(vi) ইউস্টেশিয়ান কপাটিকাঃ ইহা নিম্ন মহাশিরা ও ডান অলিন্দের মাঝখানে অবস্থিত। এই কপাটিকার মধ্য দিয়ে CO2 যুক্ত রক্ত ডান অলিন্দে প্রবেশ করে। ইটালিয়ান চিকিৎসক Bartolomeo Eustachi এ কপাটিকা আবিষ্কার করেন।

হৃৎপিন্ডের প্রকোষ্ঠ আলোচনা । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

মানুষের হৃৎপিন্ড চারটি প্রকোষ্ঠ নিয়ে গঠিত। এ গুলো হলো-
(i) ডান অলিন্দ বা অ্যাট্রিয়ামঃ ডান অ্যাট্রিয়াম বড় এবং পাতলা আবরণী দ্বারা আবৃত থাকে। এর উপরের দিকে উর্ধ্ব মহাশিরা বা সুপিরিয়র ভেনাক্যাভা এবং নিচের দিকে নিম্ন মহাশিরা বা ইনফিরিয়র ভেনাক্যাভা থাকে। ইহা ট্রাইকাসপিড কপাটিকার মাধ্যমে CO2 যুক্ত রক্ত ডান নিলয়ে পৌছে দেয়।
(ii) বাম অলিন্দ বা অ্যাট্রিয়ামঃ বাম অলিন্দ সামান্য ছোট এবং পুরু প্রাচীর দ্বারা আবৃত থাকে। এর সাথে ফুসফুসীয় শিরা যুক্ত থাকে। ইহা বাইকাসপিড কপাটিকার মাধ্যমে O2 যুক্ত রক্ত বাম নিলয়ে পৌছে দেয়। অলিন্দ দুটির মাঝখানে আন্তঃঅলিন্দ পর্দা থাকে।
(iii) ডান নিলয় বা ভেন্ট্রিকলঃ ডান নিলয় সামান্য বড় এবং পুরু প্রাচীর দ্বারা আবৃত থাকে। এর একদিকে ট্রাইকাসপিড কপাটিকা এবং অপরদিকে সেমিলুনার কপাটিকা থাকে। ইহা সেমিলুনার কপাটিকার মাধ্যমে CO2 যুক্ত রক্ত পালমোনারী ধমনীতে পৌছে দেয়।
(iv) বাম নিলয় বা ভেন্ট্রিকলঃ বাম নিলয় সামান্য ছোট এবং পুরু প্রাচীর দ্বারা আবৃত থাকে। এর প্রাচীর ডান নিলয়ের প্রাচীর অপেক্ষা তিনগুণ পুরু। নিলয়ের প্রাচীর হতে মাংসল কলামনি কর্নি সৃষ্টি হয়। এর একদিকে বাইকাসপিড কপাটিকা এবং অপরদিকে সেমিলুনার কপাটিকা থাকে। ইহা সেমিলুনার কপাটিকার মাধ্যমে O2 যুক্ত রক্ত মহাধমনী বা অ্যাওর্টায় পৌছে দেয়। নিলয় দুটির মাঝখানে আন্তঃনিলয় পর্দা থাকে।

হৃৎপিন্ডের অবস্থান ও আকৃতি । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

মানব হৃৎপিন্ড ডায়াফ্রামের উপরে বক্ষগহ্বরে দুই ফুসফুসের মাঝখানে বাম পাশে অবস্থিত। ইহা ত্রিকোনাকার মোচার মতো এবং লালচে-খয়েরি বর্ণের। এর চওড়া উর্ধ্বমুখী অংশকে ভিত্তি এবং সরু নিম্নমুখী অংশকে শীর্ষ বা apex বলে। পূর্ণবয়স্ক মানুষের হৃৎপিন্ডের দৈর্ঘ্য ১২ সেমি এবং প্রস্থ ৮ সেমি। পুরুষের হৃৎপিন্ডের ওজন ২৫০-৩৯০ গ্রাম এবং স্ত্রীর ২০০-২৭৫ গ্রাম।। পুরুষের হৃৎপিন্ড স্ত্রীলোকের চেয়ে এক-তৃতীয়ংশ বেশি হয়।

হৃৎপিন্ড কী । Heart । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

যে অঙ্গ সংকোচন-প্রসারণের মাধ্যমে দেহের সর্বত্র রক্ত সঞ্চালিত করে তাকে হৃৎপিন্ড বলে। একে জীবন্ত পাম্প যন্ত্র বা অঙ্গ বলা হয়। একজন সুস্থ মানুষের জীবনদশায় হৃৎপিন্ড ২৬০০ মিলিয়ন বার স্পন্দিত হয় এবং প্রতিটি নিলয় থেকে ১৫৫ মিলিয়ন লিটার (দেড় লক্ষ টন) রক্ত বের করে দেয়।

রক্ত গ্রহণের সময় দাতা ও গ্রহীতার রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করে নেয়া হয় কেন

রক্ত গ্রহণের সময় দাতা ও গ্রহীতার রক্তের গ্রুপ ভাল ভাবে পরীক্ষা করে নেয়া হয়। তা না হলে যে সব বিপদ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে সেগুলো হলো-

১। রক্তকণিকা জমাট বেঁধে যাবে এবং বিশ্লিষ্ট হবে

২। প্রসাবের সাথে হিমোগ্লোবিন নির্গত হবে

৩। হিমোগ্লোবিন বৃক্কে জমে ইউরোমিয়া রোগ সৃষ্টি করবে এবং বৃক্কের কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটবে

৪। জন্ডিসের প্রাদুর্ভাব হবে

৫। রোগীর মৃত্যু হতে পারে