মোজাইক প্রতিবিম্ব । Apposition । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

উজ্জ্বল আলোয় প্রতিটি ওমাটিডিয়াম স্বাধীন ভাবে কাজ করতে পারে। উজ্জ্বল আলোতে ওমাটিডিয়ামের আইরিশ এবং রেটিনাল সিথ প্রসারিত হয়। ফলে ক্রিস্টালাইন কোণ্ আবৃত হয়ে যায়। বস্তু থেকে আলোক রশ্মি কর্ণিয়ার মধ্য দিয়ে সরাসরি র‌্যাবডোমে প্রবেশ করে। এ ক্ষেত্রে শুধুমাত্র একটি ওমাটিডিয়ামের কর্ণিয়া থেকে আগত আলোক রশ্মি র‌্যাবডোমে পৌছে। পার্শ্ববর্তী কোন ওমাটিডিয়ামের আলোকরশ্মি ঐ র‌্যাবডোমে প্রবেশ করে না। ফলে একটি ওমাটিডিয়ামে একটি প্রতিবিম্ব গঠিত হয়। এ অবস্থায় প্রতিবিম্বটিকে মোজাইক করা মেঝের পাথরের মতো মনে হয়। তাই একে মোজাইক প্রতিবিম্ব বলা হয়।

ওমাটিডিয়াম এর গঠন ও কাজ । Grasshopper ommatidium । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

ঘাস ফড়িং-এর পুঞ্জাক্ষির প্রতিটি ষড়ভূজাকৃতির দর্শন একককে ওমাটিডিয়াম বলে। প্রতিটি পুঞ্জাক্ষিতে ১২০০-১৮০০ ওমাটিডিয়া থাকে। নিচে একটি ওমাটিডিয়ামের গঠন বর্ণনা করা হলো।

১। কর্ণিয়াঃ ওমাটিডিয়ামের বাইরের দিকে বর্ণহীন, স্বচ্ছ, উত্তল ও ছয়কোণাকার আবরণীকে কর্ণিয়া বলে। ইহা লেন্সের মতো কাজ করে।

২। কর্ণিয়াজেন কোষঃ কর্ণিয়ার নিচে একজোড়া কর্ণিয়াজেন কোষ থাকে। ইহা কর্ণিয়া সৃষ্টি করে।

৩। ক্রিস্টালাইন কোণ্ কোষঃ কর্ণিয়াজেন কোষের নিচে চারটি ক্রিস্টালাইন কোণ্ কোষ থাকে। ইহা ক্রিস্টালাইন কোণ্ গঠন করে।

৪। ক্রিস্টালাইন কোণ্ঃ ক্রিস্টালাইন কোণ্ কোষ দ্বারা আবৃত মোচাকৃতির অঙ্গকে ক্রিস্টালাইন কোণ্ বলে। এর মধ্য দিয়ে ওমাটিডিয়ামে আলো প্রবেশ করে।

৫। আইরিশ পিগমেন্ট আবরণঃ ক্রিস্টালাইন কোণ্ কোষের চারিদিকে যে রঙ্গীন আবরণী থাকে তাকে আইরিশ পিগমেন্ট আবরণ বলে। ইহা তীব্র আলোতে প্রসারিত হয়ে কোণ্ কোষ গুলো আবৃত করে রাখে এবং মৃদু আলোতে সংকুচিত হয়ে কোণ্ কোষ গুলে কে আংশিক উন্মুক্ত রাখে।

৬। রেটিনুলার কোষঃ কোণ্ কোষ গুলোর নিচে ৭ টি লম্বা রেটিনুলার কোষ থাকে। ইহা বৃত্তাকারে সজ্জিত থাকে। এদের এক প্রান্ত কোণ্ কোষের সাথে এবং অপর প্রান্ত স্নায়ুতন্তুর সাথে যুক্ত থাকে। ইহা আলোক সংবেদী। এদের ক্ষরণ থেকে র‌্যাবডোম সৃষ্টি হয়।

৭।  র‌্যাবডোমঃ রেটিনুলার কোষের মাঝখানে যে মাকু আকৃতির কোষ থাকে তাকে র‌্যাবডোম বলে। এর মাধ্যমে আলো গৃহীত হয়।

৮। রেটিনাল সিথঃ রেটিনুলার কোষকে ঘিরে যে কালো পর্দা থাকে তাকে রেটিনাল সিথ বলে। ইহা পাশাপাশি অবস্থিত দুটি ওমাটিডিয়ামকে পৃথক রাখে।

৯। ভিত্তি পর্দাঃ যে পাতলা পর্দার উপর ওমাটিডিয়াম অবস্থান করে তারে ভিত্তি পর্দা বলে। ইহা ওমাটিডিয়ামকে ধারণ করে।

ঘাসফড়িং-এর সংবেদী অঙ্গ । Grasshopper sensoryorgans । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

যেসব অঙ্গ পরিবেশ থেকে বিভিন্ন উদ্দীপনা গ্রহণ করে স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে উপযুক্ত প্রতিবেদন সৃষ্টি করে তাদেরকে সংবেদী অঙ্গ বা জ্ঞানেন্দ্রিয় বলে। ঘাসফড়িং এর সংবেদী অঙ্গগুলো হলো

১। আলোক সংবেদী অঙ্গঃ ঘাসফড়িংএর পুঞ্জাক্ষি ওসেলাস হলো আলোক সংবেদী অঙ্গ। পুঞ্জাক্ষিতে বস্তুর প্রতিবিম্ব গঠিত হয়। ওসেলাস আলোর তীব্রতা অনুধাবন করে।

২। তাপ সংবেদী অঙ্গঃ ঘাসফড়িংএর প্লান্টুলি প্যাড এবং রোম হলো তাপ সংবেদী অঙ্গ। প্লান্টুলি প্যাড পায়ের প্রথম তিনটি টার্সাসের গোড়ায় থাকে। অ্যান্টেনায় রোম থাকে।

৩। শ্রবণ সংবেদী অঙ্গঃ টেমপেনিক পর্দা এবং পায়ু সারকির রোম হলো ঘাসফড়িংএর শ্রবণ অঙ্গ। টেমপেনিক পর্দা প্রথম উদরীয় খন্ডকের দুপাশে থাকে।

৪। স্বাদ সংবেদী অঙ্গঃ ম্যাক্সিলারী পাল্প এবং ল্যাবিয়ামের রোম হলো ঘাসফড়িংএর স্বাদ অঙ্গ। ইহা উপযুক্ত খাদ্য বাছাই করে।

৫। গন্ধ সংবেদী অঙ্গঃ অ্যান্টেনার কিছু রোম স্বাদ অঙ্গ হিসেবে কাজ করে।

৬। স্পর্শ সংবেদী অঙ্গঃ অ্যান্টেনা, পাল্প, পায়ু সারকি এবং পায়ের রোম হলো স্পর্শ অঙ্গ।

সংবেদী অঙ্গ হলো ত্বকের রুপান্তরিত কোষ বা সেনসিলি। প্রতিটি সেনসিলিতে একটি সংবেদী কোষ, একটি ট্রাইকোজেন কোষ এবং কয়েকটি টর্মোজেন কোষ থাকে। স্বাদ, গন্ধ স্পর্শ সংবেদী অঙ্গে সেনসিলা একক ভাবে থাকে। তাপ শব্দ সংবেদী অঙ্গে সেনসিলা গুচ্ছাকারে অবস্থান করে।

ঘাস ফড়িং-এর শ্বসন প্রদ্ধতি । Grasshopper Respiration System । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

ঘাস ফড়িং-এর ট্রাকিয়া ও ট্রাকিওল দেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে জালিকার মতো বি¯তৃত থাকে এবং গ্যাসীয় পদার্থের বিনিময় ঘটায়। এদের রক্তে শ্বাসরঞ্জক না থাকায় শ্বসনে তেমন কোন ভূমিকা পালন করে না। প্রধানত শ্বাসরন্ধ্র দিয়ে শ্বাস গ্রহণ ও শ্বাস ত্যাগ করে। নিচে শ্বাস গ্রহণ ও শ্বাস ত্যাগ প্রক্রিয়া আলোচনা করা হলো।

১। শ্বাস গ্রহণ বা প্রশ্বাস (Inspiration)ঃ পেশীর প্রসারণে উদরীয় খন্ডক গুলো প্রসারিত হয়। ফলে ট্রাকিয়ার ভিতরের গহ্বরের আয়তন বৃদ্ধি পায়। এ সময় প্রথম চার জোড়া শ্বাসরন্ধ্র খুলে যায়। পরিবেশ হতে অক্সিজেন যুক্ত বাতাস শ্বাসরন্ধ্রের মধ্য দিয়ে ট্রাকিয়ার গহ্বরে প্রবেশ করে। পরে ট্রাকিয়া থেকে অক্সিজেন ট্রাকিওলে পৌছে। ট্রাকিওলের প্রাচীর পাতলা হওয়ায় ব্যাপন প্রক্রিয়ায় অক্সিজেন দেহকোষে প্রবেশ করে।

২। শ্বাস ত্যাগ বা নিঃশ্বাস (Expiration)ঃ দেহকোষে বিপাক ক্রিয়ার ফলে CO2 উৎপন্ন হয়। সৃষ্ট CO2 ব্যাপন প্রক্রিয়ায় ট্রাকিওলে প্রবেশ করে। এরপর ট্রাকিওল থেকে CO2  ট্রাকিয়ায় আসে। এ সময় পেশীর সংকোচন ঘটে। এতে উদরীয় খন্ডক গুলোর ট্রাকিয়া সংকুচিত হয় এবং ট্রাকিয়ার ভিতরের গহŸরের আয়তন কমে যায়। ফলে বাকি ছয়টি শ্বাসরন্ধ্র খুলে যায়। এই শ্বাসরন্ধ্রের মধ্য দিয়ে ট্রাকিয়ায় বিদ্যমান CO2 সজোরে বাইরে নির্গত হয়।

ঘাস ফড়িং-এর শ্বসনতন্ত্র । Grasshopper respiratory system । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

ঘাস ফড়িং-এর শ্বসনতন্ত্রকে ট্রাকিয়ালতন্ত্র বলা হয়। ট্রাকিয়া বা শ্বাসনালী এবং এর শাখা-প্রশাখা গুলো পরস্পর মিলিত হয়ে যে বিশেষ ধরনের শ্বসনতন্ত্র গঠন করে তাকে ট্রাকিয়ালতন্ত্র বলে। ট্রাকিয়ার শাখা-প্রশাখার মাধ্যমে পরিবেশ হতে অক্সিজেন দেহকোষে প্রবেশ করে এবং দেহকোষ হতে CO2 একই পথে বাইরে নির্গত হয়। ট্রাকিয়ালতন্ত্রের বিভিন্ন অংশ হলো- শ্বাসরন্ধ্র,  ট্রাকিয়া ও  ট্রাকিওল।

১। স্পাইরাক্ল বা শ্বাসরন্ধ্রঃ দেহের উভয় পাশে প্লিউরায় ১০ জোড়া শ্বাসরন্ধ্র থাকে। এদের মধ্যে ২ জোড়া বক্ষ অঞ্চলে এবং ৮ জোড়া উদর অঞ্চলে অবস্থিত। প্রতিটি স্পাইরাক্ল ডিম্বাকার ছিদ্র বিশেষ। স্পাইরাক্ল গুলো পেরিট্রিম দ্বারা আবৃত থাকে। ছিদ্র গুলোর মুখে রোমযুক্ত ছাঁকনী যন্ত্র থাকে। রোমযুক্ত ছাঁকনী যন্ত্র ধুলাবালি, জীবাণু ও পানি প্রবেশে বাধা দেয়।

২। ট্রাকিয়া বা শ্বাসনালীঃ ট্রাকিয়া হলো ঘাস ফড়িং-এর প্রধান শ্বসন অঙ্গ। ইহা সুক্ষ্ম, স্থিতিস্থাপক ও শাখা-প্রশাখাযুক্ত। ট্রাকিয়ার প্রাচীর তিন স্তরবিশিষ্ট। বাইরের এপিডার্মিস, মাঝের এপিথেলিয়াল এবং ভিতরের ইন্টিমা। ট্রাকিয়ার ভিতরে ইন্টিমা সর্পিলাকার বা আংটির মতো বলয় সৃষ্টি করে। এই বলয় গুলোকে টিনিডিয়া বলে। টিনিডিয়া থাকায় ট্রাকিয়া কখনো চুপসে যায় না। প্রধান প্রধান ট্রাকিয়া গুলো অনুদৈর্ঘ্য ও অনুপ্রস্থ ভাবে বিন্যন্ত হয়ে ৩ জোড়া ট্রাকিয়ালকান্ড গঠন করে। এ গুলো হলো পৃষ্ঠীয় অনুদৈর্ঘ্য ট্রাকিয়ালকান্ড, পার্শ্বীয় অনুদৈর্ঘ্য ট্রাকিয়ালকান্ড ও অংকীয় অনুদৈর্ঘ্য ট্রাকিয়ালকান্ড। ট্রাকিয়ার মাধ্যমে সমস্ত দেহে বায়ু প্রবাহ ঘটে।

৩। ট্রাকিওলঃ ট্রাকিয়া বিভক্ত হয়ে যে সুক্ষ্ম শাখা সৃষ্টি করে তাকে ট্রাকিওল বলে। ইহা এককোষী, ইন্টিমা ও টিনিডিয়াবিহীন এবং শাখা-প্রশাখাবিহীন। এর ব্যাস ১ mµ। ইহা তরল দ্বারা পুর্ণ থাকে। এই তরলে অক্সিজেন ও CO2 এর ব্যাপন ঘটে। ট্রাকিয়ার কিছু শাখা প্রসারিত হয়ে বায়ুথলী গঠন করে। বায়ুথলীর মধ্যে বায়ু জমা থাকে।

ট্রাকিয়া বা শ্বাসনালীর গঠন ।। ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

ট্রাকিয়া হলো ঘাস ফড়িং-এর প্রধান শ্বসন অঙ্গ। ইহা সুক্ষ্ম, স্থিতিস্থাপক ও শাখা-প্রশাখাযুক্ত। ট্রাকিয়ার প্রাচীর তিন স্তরবিশিষ্ট। বাইরের এপিডার্মিস, মাঝের এপিথেলিয়াল এবং ভিতরের ইন্টিমা। ট্রাকিয়ার ভিতরে ইন্টিমা সর্পিলাকার বা আংটির মতো বলয় সৃষ্টি করে। এই বলয় গুলোকে টিনিডিয়া বলে। টিনিডিয়া থাকায় ট্রাকিয়া কখনো চুপসে যায় না। প্রধান প্রধান ট্রাকিয়া গুলো অনুদৈর্ঘ্য ও অনুপ্রস্থ ভাবে বিন্যন্ত হয়ে ৩ জোড়া ট্রাকিয়ালকান্ড গঠন করে। এ গুলো হলো পৃষ্ঠীয় অনুদৈর্ঘ্য ট্রাকিয়ালকান্ড, পার্শ্বীয় অনুদৈর্ঘ্য ট্রাকিয়ালকান্ড ও অংকীয় অনুদৈর্ঘ্য ট্রাকিয়ালকান্ড। ট্রাকিয়ার মাধ্যমে সমস্ত দেহে বায়ু প্রবাহ ঘটে।

ঘাস ফড়িং-এর রেচন প্রক্রিয়া । Grasshopper excretion system । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

যে প্রক্রিয়ায় বিপাক ক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট নাইট্রোজেনঘটিত ক্ষতিকর বর্জ্য পদার্থ দেহের বাইরে নিষ্কাশিত হয় তাকে রেচন বলে। ঘাস ফড়িং-এর রেচন প্রক্রিয়া নিচে আলোচনা করা হলো।

১। মালপিজিয়ান নালিকাঃ মালপিজিয়ান নালিকা রক্ত হতে পানি, পটাশিয়াম ইউরেট ও CO2 শোষণ করে। নালিকার ভিতরে পানি, CO2 ও পটাশিয়াম ইউরেট একত্রে বিক্রিয়া করে পটাশিয়াম বাই কার্বনেট ও ইউরিক এসিড উৎপন্ন করে। এদের মধ্যে পটাশিয়াম বাই কার্বনেট ও পানি পুনঃশোষিত হয়ে রক্তে ফিরে যায়। অপরদিকে, ইউরিক এসিড মলাশয়ে চলে যায়। মলাশয়ে ইউরিক এসিড থেকে অতিরিক্ত পানি শোষিত হয় এবং বিশুদ্ধ ইউরিক এসিড মলের সাথে দেহের বাইরে নির্গত হয়।

রক্ত ————  পানি  +  পটাশিয়াম ইউরেট  +  CO2

পানি + পটাশিয়াম ইউরেট + CO2 —–  পটাশিয়াম বাই কার্বনেট + ইউরিক এসিড

২। ইউরেট কোষঃ যে কোষ ইউরিয়াকে ইউরেট হিসেবে জমা রাখে তাকে ইউরেট কোষ বলে। ইউরেট কোষ প্রধানত প্রোটিন, শর্করা ও স্নেহ জাতীয় খাদ্যকে পরিবর্তিত উপাদান হিসেবে সঞ্চিত রাখে। এছাড়া ইহা হিমোলিম্ফে বিদ্যমান কিছু ইউরিক এসিডকে ইউরেট হিসেবে জমা রাখে।

৩। ইউরিকোস গ্রন্থিঃ পুরুষ ঘাস ঘড়িং-এর মাশরুম গ্রন্থিতে ইউরিকোস গ্রন্থি থাকে। এরা হিমোসিল থেকে রেচন দ্রব্য শোষণ করে ইউরিক এসিড হিসেবে জমা রাখে। ইউরিক এসিড পরে শুক্রাণুর সাথে বাইরে নির্গত হয়

৪। কিউটিকলঃ নিম্ফ দশায় হিমোসিলে ভাসমান অ্যামিবোসাইট কোষ থাকে। এ সব কোষ রক্ত থেকে রেচন দ্রব্য সংগ্রহ করে কিউটিকলের নিচে জমা রাখে। খোলস মোচনের সময় পুরাতন কিউটিকলসহ সঞ্চিত রেচন দ্রব্য বাইরে নির্গত হয়।

মালপিজিয়ান নালিকার গঠন ও কাজ । Malpighian tube । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

মালপিজিয়ান নালিকা হলো ঘাসফড়িং এর প্রধান রেচন অঙ্গ। ইটালিয়ান বিজ্ঞানী মারসেলো মালপিজি (Marcello Malpighi) এই নালিকা আবিষ্কারক করেন। তাঁর নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়েছে।  ইহা হলুদ বর্ণের নালি। মেসেন্টেরন ও প্রোক্টোডিয়ামের সংযোগস্থলে ৬-৮টি নালিকা গুচ্ছ থাকে। প্রতিটি গুচ্ছে ১২-১৫টি করে মালপিজিয়ান নালিকা থাকে। অর্থাৎ এর সংখ্যা ৬০-১৫০টি। প্রতিটি নালিকার দৈর্ঘ্য ২৫ মিমি এবং ব্যাস ০.১০-১.০০ মিমি। এই নালিকা নেফ্রিডিয়াল ধরনের (একপ্রান্ত যুক্ত এবং অন্যপ্রান্ত মুক্ত)। ইহা ফাঁপা, নলাকার এবং শাখাবিহীন। নালিকার ভিতরের ফাঁপা গহŸরকে লুমেন বলে। লুমেন এপিথেলিয়াল কোষ দ্বারা আবৃত থাকে। এপিথেলিয়াল কোষের বাইরের দিকে বেসমেন্ট পর্দা এবং ভিতরের প্রান্তে সিলিয়া বা মাইক্রোভিলাই থাকে। সিলিয়া গুলো মিলে ব্রাশ বর্ডার গঠন করে। ব্রাশ বর্ডার গুলো রক্ত থেকে ইউরিয়া ও ইউরেট নিষ্কাশন করে। নালিকার বহিঃপ্রাচীরে ভিত্তি পর্দা থাকে।

মালপিজিয়ান নালিকার কাজ

১। হিমোলিম্ফ হলো নাইট্রোজেনঘটিত বর্জ্য সংগ্রহ করে।

২। বর্জ পদার্থ অন্ত্রে প্রেরণ করে।

৩। অসমোরেগুলেশনে ভূমিকা পালন করে।

ঘাস ফড়িং-এর রক্ত সংবহন প্রক্রিয়া । Blood circulation system । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

ঘাস ফড়িং-এর হৃৎযন্ত্র ও অ্যালারী পেশীর সংকোচন ও প্রসারণের ফলে দেহের বিভিন্ন অংশে রক্ত প্রবাহিত হয়। হৃৎযন্ত্রের প্রতিটি প্রকোষ্ঠ ঢেউয়ের মতো ক্রমাগত সংকুচিত ও প্রসারিত হয়ে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখে। নিচে রক্ত সংবহন প্রক্রিয়া আলোচনা করা হলো।

অ্যালারী পেশীর সংকোচনের ফলে পেরিভিসেরাল সাইনাস হতে রক্ত পেরিকার্ডিয়াল সাইনাসে প্রবেশ করে। এ সময় হৃৎযন্ত্রের প্রকোষ্ঠ গুলো প্রসারিত হয়। ফলে পেরিকার্ডিয়াল সাইনাস থেকে রক্ত অস্টিয়ার মধ্য দিয়ে হৃৎযন্ত্রের গহ্বরে প্রবেশ করে। রক্ত দ্বারা পরিপুর্ণ হওয়ার পর হৃৎযন্ত্রের প্রকোষ্ঠ গুলোর সংকোচন ঘটে। এ সময় রক্ত বহির্বাহী অস্টিয়ার মধ্য দিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হয় এবং ডর্সাল অ্যাওর্টায় প্রবেশ করে। ডর্সাল অ্যাওর্টা হতে রক্ত মস্তকের সাইনাসে প্রবেশ করে। এরপর রক্ত পশ্চাৎমুখী ভাবে প্রবাহিত হয় এবং পেরিভিসেরাল সাইনাস ও পেরিনিউরাল সাইনাসে প্রবেশ করে। এই দুটি সাইনাসের মাধ্যমে রক্ত দেহের বিভিন্ন অংশে সঞ্চালিত হয়। এ সময় রক্ত পেরিনিউরাল সাইনাস থেকে পায়ের গহ্বরে এবং পেরিকার্ডিয়াল সাইনাস থেকে ডানায় প্রবেশ করে। সবশেষে অ্যালারী পেশীর কার্যকারীতায় রক্ত পেরিভিসেরাল সাইনাস হতে পেরিকার্ডিয়াল সাইনাসে প্রবেশ করে এবং এ চক্রের পুনরাবৃত্তি  ঘটায়। এদের হার্টবিট প্রতি মিনিটে ১০০-১১০ বার এবং দেহে একবার রক্ত সংবহনে ৩০-৬০ মিনিট সময় লাগে।

ঘাস ফড়িং-এর রক্ত সংবহনতন্ত্র । Grasshopper blood circulatory system । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

যে তন্ত্রের মাধ্যমে রক্ত প্রবাহিত হয় তাকে রক্ত সংবহনতন্ত্র বলে। ঘাস ফড়িং-এর রক্ত সংবহনতন্ত্র মুক্ত ধরনের (ঘাসফড়িং, আরশোলা, চিংড়ী, মশা, মাছি, মাকড়শা, শামুক, ঝিনুক, অক্টোপাস)। যে সংবহনতন্ত্রে রক্ত হৃৎযন্ত্র থেকে অস্টিয়া বা নালিকার মাধ্যমে দেহগহŸর বা সাইনাসে মুক্ত হয় এবং পুনরায় অস্টিয়া বা নালিকার মাধ্যমে হৃৎযন্ত্রে ফিরে আসে তাকে মুক্ত রক্ত সংবহনতন্ত্র বলে। ইহা চারটি প্রধান অংশ দ্বারা গঠিত। হিমোলিম্ফ বা রক্ত, হিমোসিল, পৃষ্ঠীয় বাহিকা এবং সহায়ক স্পন্দনশীল অঙ্গ।

১। হিমোলিম্ফ বা রক্ত (Hemolymph)ঃ ঘাস ফড়িং-এর রক্ত দুটি উপাদান দ্বারা গঠিত। প্লাজমা ও হিমোসাইট।

(i) প্লাজমা বা রক্তরসঃ রক্তরস হলো বর্ণহীন তরল পদার্থ। এতে হিমোগ্লোবিন থাকে না। এতে প্রোটিন, শর্করা, গিøসারল, অ্যামাইনো এসিড, গ্লুকোজ, জৈব এসিড, এস্টার, স্টেরল, ট্রাইগিøসারাইড, ইউরিয়া, ইউরিক এসিড, নাইট্রোজেন, সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম, ফসফেট, হিমোজ্যান্থিন, ট্রিহ্যালোজ, ডাইগিøসারাইড, টাইরোসিন, ট্রাইহ্যালেস প্রভৃতি থাকে।

(ii) হিমোসাইট বা রক্তকণিকাঃ ঘাস ফড়িং-এর রক্তে শুধুমাত্র শ্বেত রক্তকণিকা বা হিমোসাইট (১৫,০০০-৬০,০০০) থাকে। এতে লোহিত রক্তকণিকা থাকে না। হিমোসাইটকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। প্রোহিমোসাইট, ট্রানজিশনাল হিমোসাইট ও বৃহদাকার হিমোসাইট। প্রোহিমোসাইট ৬-৯ mµ (২৩%), ট্রানজিশনাল হিমোসাইট ৯-১৯ mµ (৬৮%) ও বৃহদাকার হিমোসাইট ১৯-২৩ mµ (৯%)।

হিমোলিম্ফের কাজ

(i) হিমোলিম্ফ পানির আধার হিসেবে কাজ করে। এতে ৯২% পানি থাকে।

(ii) ইহা খাদ্যসার, খনিজলবণ, হরমোন রেচন পদার্থ পরিবহন করে।

(iii) দেহে পানির ভারসাম্য রক্ষা করে।

(iv) ডানা সঞ্চালন ও খোলস মোচনে সাহায্য করে।

(v) হিমোসাইট ফ্যাগোসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় জীবাণু ভক্ষণ করে। ফলে রোগ প্রতিরোধ হয়।

(vi) হিমোসাইট রক্ত জমাট বাঁধা এবং দেহের ক্ষত নিরাময় করে।

(vii) হিমোসাইট মিউকোপলিস্যাকারাইড নিঃসরণ করে যোজক কলা গঠন করে।

২। হিমোসিল (Haemocoel)ঃ গ্রিক শব্দ haema অর্থ রক্ত এবং coel অর্থ গহ্বর নিয়ে haemocoel শব্দটি গঠিত। হিমোলিম্ফ দ্বারা পরিপুর্ণ দেহগহ্বরকে হিমোসিল বলে। এদের হিমোসিলকে মিক্সোসিল বলা হয়। ইহা পৃষ্ঠীয় পর্দা ও অংকীয় পর্দা দ্বারা তিনটি প্রকোষ্ঠ বা সাইনাসে বিভক্ত। এগুলো হলো-

(i) পেরিকার্ডিয়াল সাইনাসঃ ইহা পৃষ্ঠীয় পর্দার উপরের অবস্থিত। এতে হৃৎযন্ত্র থাকে।

(ii) পেরিভিসেরাল সাইনাসঃ ইহা পৃষ্ঠীয় পর্দার নিচের অবস্থিত। এতে পৌষ্টিকনালী অবস্থান করে।

(iii) পেরিনিউরাল সাইনাসঃ ইহা অংকীয় পর্দার নিচে অবস্থিত। এতে স্নায়ুরজ্জু থাকে।

৩। পৃষ্ঠীয় বাহিকাঃ পৃষ্ঠীয় বাহিকা তিনটি অংশ নিয়ে গঠিত। এগুলো হলো-

(i) ডর্সাল অ্যাওর্টাঃ হৃৎযন্ত্রের প্রথম প্রকোষ্ঠ সরু হয়ে নলাকার অংশ গঠন করে। একে ডর্সাল অ্যাওর্টা বা মহাধমনী বলে। ইহা অগ্রবক্ষ হতে মাথা পর্যন্ত বিস্তৃত। এতে অস্টিয়া থাকে না।

(ii) হৃৎপিন্ড বা হৃৎযন্ত্রঃ ঘাসফড়িং এর হৃৎযন্ত্র পেরিকার্ডিয়াল সাইনাসে অবস্থিত। ইহা কয়েকটি ফানেলাকার প্রকোষ্ঠ দ্বারা গঠিত। প্রথম ৩টি প্রকোষ্ঠ বক্ষে এবং শেষ ১০টি প্রকোষ্ঠ উদরে অবস্থিত। দুটি প্রকোষ্ঠের মধ্যবর্তী অঞ্চলে হৃৎযন্ত্রের প্রাচীর উভয় পাশর্^ হতে ভাঁজ হয়ে হৃৎপিন্ডের গহ্বরে প্রবেশ করে। প্রতিটি ভাঁজে একটি করে ছিদ্র থাকে। একে অস্টিয়া বলে। প্রতিটি প্রকোষ্ঠ অস্টিয়া দ্বারা পেরিকার্ডিয়াল সাইনাসের সাথে যুক্ত থাকে। পরপর অবস্থিত দুটি প্রকোষ্ঠের মধ্যবর্তী ছিদ্রপথকে আন্তঃপ্রকোষ্ঠ ছিদ্র বলে।

(iii) অ্যালারি পেশি (Alary muscle)ঃ হৃৎযন্ত্রের সাথে যে ত্রিকোণাকার পেশি থাকে তাকে অ্যালারি পেশি বলে। এসব পেশি টার্গামের অঙ্কীয় তল হতে উৎপন্ন হয়। এর প্রশস্ত প্রান্ত হৃৎযন্ত্রের সাথে যুক্ত থাকে। অ্যালারী পেশী  (মোট ৬ জোড়া) হৃৎযন্ত্রকে সংকুচিত ও প্রসারিত করে।

৪। সহায়ক স্পন্দনশীল অঙ্গঃ অ্যান্টেনা, পা ও ডানার গোড়ায় সহায়ক অঙ্গ থাকে। প্রতিটি উপাঙ্গে একটি অ্যাম্পুলা ও একটি নালিকা থাকে। এরা স্পন্দনের মাধ্যমে হিমোলিম্ফকে সাইনাস থেকে উপাঙ্গে প্রবেশ করায়।