মোমের কাজ/গুরুত্ব

(i) মোম উদ্ভিদের কান্ড, পাতা, ফল ও ফুলের উপর পানি প্রতিরোধক স্তর হিসেবে কাজ করে।
(ii) মোম উদ্ভিদ অঙ্গের প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে।
(iii) মোম থেকে মোমবাতি তৈরী হয়।
(iv) ইহা প্রসাধনী শিল্পে ব্যবহার হয়।
(v) মোম আবৃত পালক ও লোম পানি প্রতিরোধী হয়।
(vi) পাতা ও কচি কান্ডে মোমের আবরণী প্রস্বেদন হ্রাস করে।
(vii) কোষপ্রাচীরে কিউটিন ও সুবেরিনের আবরণী তৈরী হয়। কিউটিন ও সুবেরিন হলো মোম জাতীয় পদার্থ।
(viii) ইহা ফল সংরক্ষণে ব্যবহার হয়।

মোমের বৈশিষ্ট্য

(i) মোম বর্ণহীন ও গন্ধহীন।
(ii) মোম পানিতে অদ্রবণীয়, কিন্তু জৈব দ্রাবকে দ্রবণীয়।
(iii) ইহা রাসায়নিক ভাবে নিষ্ক্রিয়।
(iv) সাধারণ তাপমাত্রায় মোম কঠিন অবস্থায় থাকে।
(v) এতে সম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড থাকে।
(vi) ইহা পানি বিকর্ষী।
(vii) এর গলনাঙ্ক চর্বির চেয়ে বেশি।

মোম (Wax) কী?

উচ্চ আণবিক ওজন বিশিষ্ট ফ্যাটি এসিড ও মনোহাইড্রিক অ্যালকোহলের এস্টারকে মোম বলে। ফ্যাটি এসিডের কার্বন সংখ্যা ১৪-৩৬ এবং অ্যালকোহলের কার্বন সংখ্যা ১৬-৩৬। মোম পানিতে অদ্রবণীয়, কিন্তু জৈব দ্রাবকে দ্রবণীয়। ইহা রাসায়নিক ভাবে নিষ্ক্রিয়। সাধারণ তাপমাত্রায় কঠিন অবস্থায় থাকে। উদ্ভিদের কান্ড, পাতা, ফুল ও ফলের ত্বকে মোম থাকে। ব্রাজিলিয়ান পাম গাছ থেকে কারনোবা মোম উৎপন্ন হয়। বিভিন্ন ধরনের মোম হলো- ল্যানোলিন, মৌচাকের মোম, পালকের মোম, লোমের মোম, বিওয়াক্স, কারনোবা, সিবাম, সেরুমেন, সুবেরিন ইত্যাদি।

তেল ও চর্বির কাজ/গুরুত্ব

(i) তেল ও চর্বি শক্তির ঘনীভূত উৎস। শর্করা সরবরাহের ঘাটতিতে এরা শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে।
(ii) অ্যাডিপোজ কলায় বিদ্যমান চর্বিকোষ তাপের অপচয় রোধ করে এবং দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় রাখে।
(iii) ভিটামিন A, D, E ও K চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিন। তেল জাতীয় খাবার গ্রহণ করে এ সব ভিটামিনের চাহিদা পূরণ হয়।
(iv) তেল ও চর্বি দেহে ফ্যাটি এসিডের প্রধান উৎস। ইহা বিপাক ক্রিয়া ও গাঠনিক কাজ করে।
(v) উদ্ভিদের ফল ও বীজে সঞ্চিত চর্বি খাদ্য হিসেবে জমা থাকে।
(vi) বীজে সঞ্চিত তেল ও চর্বি শর্করায় রুপান্তরিত হয়ে বর্ধিঞ্চু ভ্রæণের পুষ্টি যোগায়।
(vii) চর্বি দেহে LDL-এর মাত্রা বৃদ্ধি করে হৃদরোগের ঝুকি বাড়ায়।
(viii) তেল দেহে LDL-এর মাত্রা কমিয়ে হৃদরোগের ঝুকি কমায়

সরল লিপিড (Simple Lipid)

যে সব লিপিডকে ভাঙ্গলে বা বিশ্লেষণ করলে ফ্যাটি এসিড ও গিøসারল ছাড়া অন্য কোন উপাদান পাওয়া যায় না তাদেরকে সরল লিপিড বলে। ইহা দুই প্রকার। এগুলো হলো-
১। ট্রাইগিøসারাইড বা স্নেহ দ্রব্যঃ ফ্যাটি এসিড ও গিøসারলের এস্টারকে স্নেহ দ্রব্য বলে। ইহা তিন অণু ফ্যাটি এসিড ও এক অণু গিøসারল দ্বারা গঠিত। তাই একে ট্রাইগিøসারাইড বলা হয়। অতিরিক্ত ট্রাইগিøসারাইড অ্যাথারোস্কে¬রোসিস রোগ সৃষ্টি করে যা হৃদরোগ ও স্ট্রোকের কারণ। ট্রাইগিøসারাইড দুই ভাগে বিভক্ত।
(i) তেলঃ যে সব ট্রাইগিøসারাইড অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড দ্বারা গঠিত এবং সাধারণ তাপমাত্রায় (২০০ সে.) তরল অবস্থায় থাকে তাকে তেল বলে। এদের গলনাঙ্ক খুব কম, ৫০ সে. এর কাছাকাছি। উদ্ভিজ্জ চর্বি ও পাম অয়েল এর গলনাঙ্ক বেশি। নারিকেল তেল কম তাপমাত্রায় জমাট বাঁধে।
(ii) চর্বিঃ যে সব ট্রাইগিøসারাইড সম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড দ্বারা গঠিত এবং সাধারণ তাপমাত্রায় (২০০ সে.) কঠিন অবস্থায় থাকে তাকে চর্বি বলে। এদের গলনাঙ্ক বেশি, ৭০০ সে. এর কাছাকাছি। যেমন- মাছের তেল, বাটার, ঘি, নারিকেল তেল, প্রাণীজ চর্বি, অলিভ অয়েল, পাম অয়েল ও চকোলেট।
কাজঃ উদ্ভিদের ফল ও বীজে তেল ও চর্বি সঞ্চিত খাদ্য হিসেবে জমা থাকে। অঙ্কুরোদগমের সময় তেল ও চর্বি কার্বোহাইড্রেটে রুপান্তরিত হয় এবং বর্ধিঞ্চু ভ্রƒণের খাদ্য যোগায়।

লিপিডের শ্রেণীবিভাগ (Classification of Lipid)

NaOH/KOH এর সাথে বিক্রিয়ার ভিত্তিতে লিপিড দুই ধরনের।
১। সাবানায়নঃ এই লিপিডে একটি কার্যকরী এস্টার গ্রুপ থাকে এবং ইহা ক্ষারীয় মাধ্যমে আর্দ্র বিশ্লেষিত হয়। যেমন-ট্রাইগিøসারাইড, ফসফোলিপিড, গ্লাইকোলিপিড, স্ফিংগোলিপিড, মোম ইত্যাদি।
২। অ-সাবানায়নঃ এই লিপিডে কার্যকরী এস্টার গ্রুপ থাকে না এবং ইহা ক্ষারীয় মাধ্যমে আর্দ্র বিশ্লেষিত হয় না। যেমন- টারপিন, প্রোস্টোগ্লান্ডেন স্টেরয়েড ইত্যাদি।
আণবিক গঠনের উপর ভিত্তি করে লিপিডকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
১। নিউট্রাল লিপিড, ২। ফসফোলিপিড, ৩। গ্লাইকোলিপিড, ৪। টারপিনয়েডস্ ও ৫। মোম

লিপিডের রাসায়নিক পরীক্ষা

১। লিবারম্যান বারচারড পরীক্ষাঃ লিপিডকে ক্লোরোফর্মে দ্রবীভূত করে কয়েক ফোটা অ্যাসিটিক অ্যানহাইড্রাইড ও গাঢ় H2SO4 যোগ করলে প্রথমে লাল, পরে নীল এবং সবশেষে নীলাভ-সবুজ বর্ণ ধারণ করে।
২। সাকোস্কি পরীক্ষাঃ লিপিডকে ক্লোরোফর্মে দ্রবীভূত করে সমপরিমাণ গাঢ় H2SO4 যোগ করলে প্রথমে নীলাভ-লাল এবং পরে কালচে লাল বর্ণ ধারণ করে।

লিপিডের উৎস (Source of Lipid)

১। প্রাণিজ উৎসঃ প্রাণিজ চর্বি, মাখন, ঘি, বাটার, ডিম প্রভৃতি লিপিডের প্রাণিজ উৎস।
২। উদ্ভিদ উৎসঃ সয়াবিন, তিল, তিসি, সূর্যমুখী, চীনাবাদাম, পাম, নারিকেল, সরিষা, রেড়ি, জলপাই প্রভৃতি লিপিডের উদ্ভিজ উৎস

লিপিডের বৈশিষ্ট্য

১। লিপিড বর্ণহীন, স্বাদহীন ও গন্ধহীন পদার্থ।
২। ইহা পানিতে অদ্রবণীয়, কিন্তু জৈব দ্রাবকে (ইথার, ক্লোরোফর্ম, বেনজিন, ইথাইল অ্যালকোহল, কার্বনটেট্রাক্লোরাইড, হেক্সোন) দ্রবণীয়।
৩। এরা ফ্যাটি এসিডের এস্টার হিসেবে কাজ করে।
৪। আণবিক ওজন বৃদ্ধির সাথে সাথে এর গলনাঙ্ক বৃদ্ধি পায় (এর নির্দিষ্ট কোন গলনাঙ্ক নাই)।
৫। একে আর্দ্র বিশ্লেষণ করলে ফ্যাটি এসিড ও গিøসারল পাওয়া যায়।
৬। লিপিডের আপেক্ষিক গুরুত্ব ১ এর কম তাই পানিতে ভাসে। লিপিডের আপেক্ষিক গুরুত্ব ০.৮৬।
৭। এর প্রকৃতি হাইড্রোফোবিক বা অ্যাম্ফিফিলিক ধরনের।
৮। এরা ক্ষুদ্র এবং আণবিক ওজন ১০,০০০ ডাল্টন এর কম।
৯। সাধারণ তাপমাত্রায় তরল লিপিডকে তৈল এবং অর্ধতরল বা কঠিন লিপিডকে চর্বি বলে।
১০। ইহা Sudan-III এর সাথে বিক্রিয়া করে লাল বর্ণ ধারণ করে।
১১। ইহা পানিতে সমসত্ত¡ভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
১২। ক্ষারের উপস্থিতিতে লিপিডকে আর্দ্র বিশ্লেষণ করলে সাবান উৎপন্ন হয়।
১৩। লিপিড সাধারণ তাপমাত্রায় তরল ও কঠিন অবস্থায় থাকে।

লিপিড (Lipid) কী?

গ্রিক শব্দ lipos অর্থ ফ্যাট থেকে Lipid শব্দটির উৎপত্তি। কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন দ্বারা গঠিত যে সব জৈব যৌগ পানিতে অদ্রবণীয়, কিন্তু বেনজিন, ইথার, অ্যালকোহল, ক্লোরোফরম, হেক্সোন, অ্যাসিটোন প্রভৃতি জৈব দ্রাবকে দ্রবণীয় তাদেরকে লিপিড বলে। জীবদেহের মাত্র ০.৫% লিপিড দ্বারা গঠিত। ১৯৪৩ সালে জার্মান বিজ্ঞানী Bloore সর্বপ্রথম Lipid শব্দটি ব্যবহার করেন।