শিল্প ক্ষেত্রে এনজাইমের ব্যবহার

(i) খাদ্য প্রক্রিয়াজাতঃ স্টার্চ থেকে কর্ন সিরাপ তৈরীতে অ্যামাইলেজ ব্যবহার হয়। বিস্কুট তৈরীর ময়দায় প্রোটিনের পরিমাণ কমাতে প্রোটিয়েজ এনজাইম ব্যবহার হয়। কফি প্রক্রিয়াজাত করতে সেলুলেজ প্রয়োজন হয়। বেকারী শিল্পে স্টার্চ থেকে চিনি তৈরীতে ক্যাটালেজ এনজাইম ব্যবহার হয়।
(ii) শিশু খাদ্যঃ শিশু খাদ্যকে সহজ পাচ্য করতে ট্রিপসিন ব্যবহার করা হয়।
(iii) কাগজ শিল্পেঃ কাগজের আকার ও আবরণ তৈরীতে অ্যামাইলেজ ব্যবহার হয়। কাগজ বর্ণহীন করার সময় বিøচিং-এর পরিমাণ কমাতে জাইলেনেজ ব্যবহার হয়। কাগজ মসৃণ করতে এবং কাগজে পানির পরিমাণ কমাতে সেলুলেজ প্রয়োজন হয়। কাগজ থেকে লিগনিন অপসারণ করতে লিগনিনেজ এনজাইম ব্যবহার হয়।
(iv) মদ শিল্পেঃ মদের কাঁচামাল তৈরীতে অ্যামাইলেজ, গ্লুকোনেজ ও প্রোটিয়েজ ব্যবহার হয়। বিয়ার ও মদ তৈরীতে α অ্যামাইলেজ ও β অ্যামাইলেজ ব্যবহার হয়। বিয়ারের ঘোলাত্ব দূর করতে প্রোটিয়েজ এনজাইম ব্যবহার হয়।
(v) দুগ্ধ শিল্পেঃ দুগ্ধ প্রোটিন থেকে পনির তৈরী করতে রেনিন ব্যবহার হয়। ফ্রান্সে ভেড়ার দুধের নীল পনিরকে পরিপক্ক করতে লাইপেজ ব্যবহার হয়। ল্যাকটোজ থেকে গ্লুকোজ ও গ্যালাকটোজ তৈরী করতে ল্যাকটেজ এনজাইম প্রয়োজন হয়।
(vi) ফটোগ্রাফি শিল্পেঃ ফিল্মের জেলাটিন পরিষ্কার করতে প্রোটিয়েজ ব্যবহার হয়।
(vii) রাবার শিল্পেঃ ল্যাটেক্স থেকে রাবার তৈরীর সময় ক্যাটালেজ এনজাইম প্রয়োজন হয়।
(viii) জৈবিক ডিটারজেন্টঃ কাপড় থেকে প্রোটিনের দাগ তুলতে প্রোটিয়েজ ব্যবহার হয়। কাপড় ও বাসন-কোসন থেকে স্টার্চের দাগ তুলতে অ্যামাইলেজ ব্যবহার হয়। কাপড়ের বায়োলজিক্যাল কন্ডিশনার হিসেবে সেলুলেজ ব্যবহার হয়। কাপড় থেকে তেল ও চর্বির দাগ তুলতে লাইপেজ এনজাইম ব্যবহার হয়।
(ix) বায়োফুয়েল শিল্পেঃ ফার্মেন্টেশন প্রক্রিয়ায় ইথানল উৎপাদন করতে সেলুলেজ ব্যবহার হয়।
(x) আইসক্রীম তৈরীঃ ল্যাক্টেজ এনজাইম ব্যবহার করে নরম ও মোলায়েম আইসক্রিম তৈরী করা হয়।
(xi) ক্যান্ডি তৈরীঃ ইনভার্টেজ এনজাইম ব্যবহার করে ক্যান্ডি তৈরী করা হয়।
আণবিক জীববিজ্ঞানসহ বিভিন্ন গবেষণা কাজে এনজাইমের ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এনজাইম ছাড়া বিপাক তথা জীবন চলে না। তাই বলা যায় এনজাইমের সিস্টেমেটিক কার্যক্রমই জীবন।

পরিপাকে এনজাইমের ভূমিকা

পেপসিন, ট্রিপসিন, কাইমোট্রিপসিন, অ্যামাইনোট্রিপসিন, পেপটাইডেজ প্রভৃতি এনজাইম প্রোটিন জাতীয় খাদ্যকে পরিপাক করে অ্যামাইনো এসিড উৎপন্ন করে। টায়ালিন, অ্যামাইলেজ, মলটেজ, আইসোমলটেজ, ল্যাকটেজ প্রভৃতি এনজাইম কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার পরিপাক করে গ্লুকোজে পরিনত করে। লাইপেজ, ফসফোলাইপেজ, লেসিথিনেজ, কোলেস্টেরল এস্টারেজ, মনোগিøসারিডেজ প্রভৃতি এনজাইম লিপিড জাতীয় খাদ্যকে পরিপাক করে ফ্যাটি এসিড ও গিøসারল উৎপন্ন করে।

ফলের জুস তৈরীতে এনজাইম

ফলের রস বর্তমানে একটি জনপ্রিয় খাবার। আম, আঙ্গুর, আপেল, কমলা, আনারস প্রভৃতি ফলের রস তৈরীতে এনজাইম ব্যবহার করা হয়। ফলের জুসকে পরিষ্কার করতে সেলুলেজ ও পেকটিনেজ এনজাইম ব্যবহার হয়।

পরিবেশ সংরক্ষণে এনজাইমের ভূমিকা

পরিবেশ সংরক্ষণ আজ বিশ্বব্যাপী আন্দোলনে রুপ নিয়েছে। এনজাইম প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে। এনজাইম ব্যবহার করে বায়োসেন্সর বা জৈব সংবেদক তৈরী করা হয়। এই Biosensors পরিবেশে বিদ্যমান বিভিন্ন ধরনের দুষকের পরিমাণ নির্ধারণ করে।

অ্যান্টিবায়োটিক তৈরীতে এনজাইমের ভূমিকা

১৯২৯ সালে আলেকজেন্ডার ফ্লেমিং সর্বপ্রথম Penicillium notatum থেকে পেনিসিলিন নামক অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদন করেন যা ব্যবহার করে বহু রোগীর জীবন রক্ষা পাচ্ছে। ইহা জীবাণুর কর্মক্ষমতার বিরুদ্ধে কাজ করে। ইহা চিকিৎসা শাস্ত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।

জীব প্রযুক্তিতে এনজাইমের ভূমিকা

(i) জীন প্রকৌশলে বিভিন্ন ধরনের এনজাইম ব্যবহার করে রিকম্বিনেন্ট DNA তৈরী করা হয়।
(ii) DNA ও RNA এর ক্ষারক বিন্যাস নির্ণয় ও নিউক্লিওটাইডের সংযোজন বা বিয়োজন ঘটানো হয়।
(iii) রেস্ট্রিকশন এনজাইমের সাহায্যে DNA কর্তন এবং লাইপেজ এনজাইম ব্যবহার করে DNA খন্ডের জোড়া লাগানো হয়।
(iv) এনজাইম ব্যবহার করে প্রাণীর দুধ, রক্ত ও মুত্র থেকে প্রয়োজনীয় ওষুধ তৈরী করা করা হয়।

চিকিৎসায় এনজাইমের ব্যবহার

(i) কৃমিনাশক হিসেবে ফেমিন বা ব্রোমালিন এনজাইম ব্যবহার হয়।
(ii) থ্রম্বিন দেহের রক্ত ক্ষরণ বন্ধ করে। ইউরোবাইলেজ নামক এনজাইম মস্তিষ্ক ও ধমনীর জমাট রক্ত গলাতে ব্যবহার করা হয়।
(iii) ইউরিকেজ ও ইউরিয়েজ এনজাইমের মাধ্যমে রক্তে ইউরিক এসিড ও ইউরিয়ার পরিমাণ নির্ণয় করা হয়।
(iv) ডায়াবেটিস রোগীর রক্তে শর্করার পরিমাণ নির্ণয়ের জন্য গ্লুকোজ অক্সিডেজ ও পারঅক্সিডেজ নামক এনজাইম ব্যবহার করা হয়।
(v) পেটের পীড়ায় অ্যামাইলেজ, পেপসিন, লাইপেজ ইত্যাদি এনজাইম ওষুধ হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
(vi) চোখের ছানির অস্ত্রোপচারে ট্রিপসিন ব্যবহার হয়।
(vii) প্রোটিওলাইটিক এনজাইম ব্যবহার করে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং মৃত্যুর ঝুকি অনেকটা কমানো সম্ভব হয়েছে।
(viii) দেহের ক্ষত স্থান পরিষ্কার করতে ট্রিপসিন এনজাইম ব্যবহার হয়।

বায়োলজিক্যাল কার্যক্রমে এনজাইমের ভূমিকা

(i) পেকটিক এনজাইম আম, আপেল, আঙ্গুর প্রভৃতির রস তৈরীতে ব্যবহার হয়।
(ii) কাপড়ের বড় বড় দাগ মোচনে ইহা ব্যবহার হয়।
(iii) ট্যানারীতে কাঁচা চামড়া থেকে লোম পৃথক করতে এনজাইম ব্যবহার হয়।

খাদ্য তৈরীতে এনজাইমের ভুমিকা

বিভিন্ন ধরনের খাদ্য তৈরী করতে এনজাইমের ভুমিকা রয়েছে। রেনিন এনজাইমের সাহায্যে দুধ থেকে পনির তৈরী করা হয়। রেনিন দুধের ননীকে জমাট বাঁধতে সহায়তা করে এবং পরে ননী থেকে পনির তৈরী করা হয়। মাংস নরম করার জন্য রান্নার আগে মাংসের সাথে ব্রোমিলেইন অথবা পেপিন নামক এনজাইম মিশিয়ে দেয়া হয়। ইনভারটেজ এনজাইম ব্যবহার করে ক্যান্ডি তৈরী করা হয় এবং ল্যাকটেজ এনজাইমের সাহায্যে উহা নরম করা হয়। আইসক্রিম ও পাউরুটি তৈরী করতে এনজাইম ব্যবহার করা হয়।

ক্যাটালেজ এনজাইম

যেসব এনজাইম হাইড্রোজেন পার অক্সাইডকে ভেঙ্গে পানি ও অক্সিজেন উৎপন্ন করে তাদেরকে ক্যাটালেজ বলে। অক্সিজেন যুক্ত সকল জীবকোষে ক্যাটালেজ এনজাইম থাকে। এর উৎপাদন ক্ষমতা সকল এনজাইমের চেয়ে বেশি। এক অণু ক্যাটালেজ প্রতি সেকেন্ডে H2O2 থেকে কয়েক লক্ষ পানি ও অক্সিজেন উৎপন্ন করে। ক্যাটালেজের ব্যবহার বা গুরুত্ব হলো-
(i) দুগ্ধশিল্পে ক্যাটালেজ ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয়। পনির তৈরীর পূর্বে দুধ থেকে H2O2 অপসারণে ক্যাটালেজ এনজাইম ব্যবহার করা হয়।
(ii) বস্ত্রশিল্পে ইহা ব্যবহার হয়। কাপড় থেকে H2O2 অপসারণে ক্যাটালেজ এনজাইম ব্যবহার করা হয়।
(iii) ইহা চোখের contact lens পরিষ্কারক হিসেবে ব্যবহার হয়।
(iv) খাদ্যের জারণ-বিজারণ রোধে খাদ্যের মোড়কে এটি ব্যবহার হয়।
(v) কাপড় থেকে H2O2 অপসারণে ইহা ব্যবহার হয়।