রাবার -Rober

৩০০০-৬০০০ কার্বন পরমাণু বিশিষ্ট আইসোপ্রেনয়েড যৌগকে রাবার বলে। ইহা এক প্রকার পলিটারপিন। এর আণবিক ওজন প্রায় ৩ লক্ষ ডাল্টন। কৃত্রিম ভাবে যে রাবার তৈরী করা হয় তাকে গাম রাবার বলে। ইহা বিশে^র প্রায় ৮০% শিল্পের সাথে জড়িত। গ্রীষ্মমন্ডলী উদ্ভিদের ল্যাটেক্সে রাবার পাওয়া যায়। Euphorbiaceae গোত্রের উদ্ভিদ থেকে রাবার পাওয়া যায়। উল্লেখযোগ্য রাবার হলো- প্যারা রাবার (Hevea brasiliensis), ভারতীয় রাবার (Ficus elastica), পানামা রাবার (Castilla elastica), সিরাম রাবার (Manihot glaziovii), গ্যাটা (Palaquium gutta), চিকল (Achras sp.) প্রভৃতি।
রাবারের কাজ
আমাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্য, বাসস্থান, শিল্প প্রভৃতিতে রাবারের গুরুত্ব অপরিসীম। রাবার দ্বারা খেলনা, গ্লাভস, ইরেজার, আঠা, রাবার ব্যান্ড, ইনসুলেটর, টায়ার প্রভৃতি তৈরী করা হয়। গ্যাটা থেকে চিরুণী ও বোতাম তৈরী করা হয়। চিকল থেকে চুইংগাম তৈরী হয়।

স্টেরয়েড-Steroid

২৭-২৯ কার্বন পরমাণু বিশিষ্ট আইসোপ্রেনয়েড যৌগকে স্টেরয়েড বলে। হাইড্রোক্সিল গ্রæপ যুক্ত স্টেরয়েডকে স্টেরল বলে। প্রাণীর স্টেরলকে জুস্টেরল এবং উদ্ভিদের স্টেরলকে ফাইটোস্টেরল বলে। প্রাণীদেহে বিদ্যমান গুরুত্বপুর্ণ স্টেরল হলো কোলেস্টেরল। উদ্ভিদদেহে বিদ্যমান গুরুত্বপুর্ণ স্টেরল হলো- আর্গোস্টেরল (নিউরোস্পোরা ও ঈস্ট), স্টিগাস্টেরল (আঙ্গুর, নারকেল ও সয়াবিন), বিটা সিটেস্টেরল (দানা শস্য), স্পাইনেস্টেরল (পালং ও বাঁধাকপি), কোলেস্টেরল (আলু ও চুপড়ি আলু), ডিজিট্যালিন, জাইমোস্টেরল, মাইকোস্টেরল প্রভৃতি।
স্টেরয়েডের জৈবিক গুরুত্ব
(i) স্টেরয়েড কোষের সংকেত প্রদানকারী অণু হিসেবে কাজ করে।
(ii) ইহা কোষের আবরণী গঠন করে।
(iii) কোলেস্টেরল কোষ আবরণীর তারল্যতা হ্রাস করে।
(iv) ইহা কোষে ঘনীভূত শক্তির আধার। তবে ইহা দেহে কোন শক্তি সরবরাহ করে না।
(v) স্টেরয়েড ক্ষরণ বেশি হলে ম্যালিগন্যান্ট প্রোস্টেট ক্যান্সার বৃদ্ধি পায়।
(vi) স্টেরয়েড যৌন হরমোন হিসেবে কাজ করে। কর্টিসল যৌন বিকাশে ভূমিকা রাখে।
(vii) কর্টিসল স্টেরয়েড কার্বোহাইড্রেট ও প্রোটিন হজম করে এবং পানি ও লবণের ভারসাম্য বজায় রাখে।
(viii) স্টেরয়েড ওষুধ হিসেবে ব্যবহার হয়। ডিজিট্যালিন হৃৎরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।
(ix) আর্গোস্টেরল আল্ট্রা-ভায়োলেট রশ্মির প্রভাবে ভিটামিন-ডি তে পরিনত হয়।

জাতক বা উৎপাদিত লিপিড (Derivates Lipid)

যে সব লিপিড যৌগিক লিপিড থেকে উৎপন্ন হয় তাকে উৎপাদিত লিপিড বা ডেরিভেড বলে। যেমন- মনোগিøসারাইড, ডাইগিøসারাইড, ফ্যাটি এসিড, ফ্যাটি অ্যালকোহল, স্টেরয়েড, টারপিন, কিটোনবডি, রাবার, হাইড্রোকার্বন, ক্লোরোফিল, ক্যারোটিনয়েড ইত্যাদি।

সালফোলিপিড

যে সব লিপিড ফ্যাটি এসিড, গিøসারল ও সালফেট দ্বারা গঠিত তাদেরকে সালফোলিপিড বলে। ক্লোরোপ্লাস্টের ঝিল্লিতে প্রচুর পরিমাণে সালফোলিপিড থাকে। ইহা সালোকসংশ্লেষণে সাহায্য করে।

স্ফিংগোলিপিড

এই লিপিড স্নায়ুকোষ এবং মস্তিষ্কে পাওয়া যায়। এতে গ্লিসারল থাকে না, কিন্তু অ্যামিন থাকে। গ্রীক পুরাণে বর্ণিত রাক্ষুস স্ফিংক্স এর নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়েছে। স্ফিংক্স এর দৈহিক গঠনে অর্ধেক নারী এবং অর্ধেক সিংহ। কোন ব্যক্তি তার কুট প্রশ্নের (riddles) উত্তর দিতে না পারলে স্ফিংক্স তাকে ভক্ষণ করতো। Johann Thudichum (১৮৭৪) স্ফিংগোলিপিড শব্দটি ব্যবহার করেন।

লিপোপ্রোটিন (Lipoprotein)

যে সব লিপিড ফ্যাটি এসিড, গিøসারল ও প্রোটিন দ্বারা গঠিত তাদেরকে লিপোপ্রোটিন বলে। মাইটোকন্ড্রিয়া ও ক্লোরোপ্লাস্টের আবরণীতে এই লিপিড থাকে। ইহা মাইটোকন্ড্রিয়ার ইলেকট্রন ট্রান্সপোর্ট সিস্টেমের সাথে জড়িত এবং শক্তি উৎপন্ন করে। রক্তরসে, ডিমের কুসুমে এবং দুধে লিপোপ্রোটিন থাকে। উদাহরণ- কিউটিন, সুবেরিন ইত্যাদি।
লিপোপ্রোটিন ৫ ধরনের হয়। এগুলো হলো-
(i) কাইলোমাইক্রনঃ কাইলোমাইক্রন হলো ফ্যাট ও প্রোটিন দ্বারা গঠিন পোলাইপোপ্রটি কণিকা। ইহা কোলেস্টেরলের বাহক হিসেবে কাজ করে।
(ii) VLDL : Very Low Density Lipoprotein কে VLDL বলা হয়। ইহা অতি নি¤œ ঘনত্বের লিপোপ্রোটিন।
(iii) IDL : Intermediate Density Lipoprotein কে সংক্ষেপে IDL বলা হয়। ইহা মধ্যম ঘনত্বের লিপোপ্রোটিন।
(iv) LDL : Low Density Lipoprotein কে সংক্ষেপে LDL বলা হয়। ইহা নি¤œ ঘনত্বের লিপোপ্রোটিন। রক্তে কোলেস্টেরলের স্বাভাবিক মাত্রা ০.১৫-১.২০%। রক্তে LDL এর মাত্রা বেশি থাকা ক্ষতিকর (<100 mg/dl)। প্রতি অণু LDL প্রায় ১৫০০ কোলেস্টেরল এস্টার বহন করে। রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি হলে রক্তনালীর ভিতরের গাত্রে জমা হয়ে রক্ত প্রবাহ পথ সরু করে দেয়। এতে শরীরে রক্তচাপ বেড়ে যায় এবং রক্ত প্রবাহ কমে যায়। ফলে হৃৎযন্ত্রে রক্ত চলাচল কমে যায় এবং হৃৎরোগ হয়। এর মাত্রা বেশি হলে ব্যক্তি অচেতন হয়ে পড়ে। বুকে ব্যথা হয়। হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। হার্ট ফেইলর দেখা যায়। করোনারী থ্রম্বোসিস হতে পারে। সাধারণত পুরুষদের LDL বেশি থাকে এবং মহিলাদের কম থাকে। LDL কে খারাপ বা মন্দ কোলেস্টেরল (Bad cholesterol) বলা হয়।
(v) HDL : High Density Lipoprotein কে সংক্ষেপে HDL বলা হয়। ইহা উচ্চ ঘনত্বের লিপোপ্রোটিন। মানুষের রক্তে HDL এর মাত্রা বেশি থাকা ভাল (40<mg/dl)। এরা মুক্ত ফ্যাটকে হৃৎপিন্ড থেকে শরীরের প্রান্তীয় অংশে ছড়িয়ে দেয়। এতে রক্ত চাপ কমে যায় এবং রক্ত চলাচল স্বাভাবিক থাকে। ফলে হৃৎরোগ হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। সাধারণত মহিলাদের HDL বেশি থাকে এবং পুরুষদের কম থাকে। HDL কে ভাল কোলেস্টেরল (Good cholesterol) বলা হয়।

ফসফোলিপিড (Phospholipid)

যে সব লিপিড ফ্যাটি এসিড, গিøসারল ও ফসফেট দ্বারা গঠিত তাদেরকে ফসফোলিপিড বলে। এর গাঠনিক উপাদান হলো ফসফোটাইডিক এসিড। ফসফোলিপিডের ফসফেট গ্রুপটি কোলিন দ্বারা এস্টারীভূত হলে লেসিথিন এবং সেরিন হাইড্রোক্সিল দ্বারা এস্টারীভূত হলে সেফালিন উৎপন্ন হয়। লেসিথিন হলো প্রথম শনাক্তকারী ফসফোলিপিড। ফসফোলিপিড হলো-লেসিথিন, সেফালিন, প্লাজমালোজেন, কোলিন, সিরিন, কার্ডিওলিপিন, স্ফিংগোমায়োলিন ইত্যাদি।
ফসফোলিপিড তিন ধরনের। এগুলো হলো-
(i) ফসফোগিøসারাইডঃ যে ফসফোলিপিড গিøসারল, ফ্যাটি এসিড ও ফসফোরিক এসিড দ্বারা গঠিত তাকে ফসফোগিøসারাইড বলে। ইহা কোষ পর্দায় উপস্থিত থাকে। যেমন- লেসিথিন।
(ii) ফসফোইনোসিটাইডঃ যে ফসফোলিপিড গিøসারল, ফ্যাটি এসিড, ফসফোরিক এসিড ও ইনোসিটল দ্বারা গঠিত তাকে ফসফোইনোসিটাইড বলে। ইহা মস্তিষ্কে উপস্থিত থাকে। ইহা সয়াবিনে পাওয়া যায়।
(iii) ফসফোস্ফিঙ্গোসাইডঃ যে ফসফোলিপিড ফ্যাটি এসিড, ফসফোরিক এসিড ও স্ফিঙ্গোসিন দ্বারা গঠিত তাকে ফসফোস্ফিঙ্গোসাইড বলে। ইহা প্রাণীর স্নায়ু কলায় থাকে।
ফসফোলিপিডের কাজ
(i) ফসফোলিপিড কোষের মাইটোকন্ড্রিয়া, ক্লোরোপ্লাস্ট, টনোপ্লাস্ট, এন্ডোপ্লাজমিক জালিকা, নিউক্লিয়াস প্রভৃতির ঝিল্লি গঠন করে।
(ii) ইহা কোষের ভেদ্যতা ও পরিবহন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।
(iii) কয়েকটি এনজাইমের প্রোসথেটিক গ্রুপ হিসেবে কাজ করে।
(iv) ইহা প্রাণীদেহে রক্ত তঞ্চন বা জমাট বাঁধতে সাহায্য করে।
(v) ইহা কোষের আয়ন হিসেবে কাজ করে। গ্লুকোজ, পানি ও চার্জযুক্ত আয়নের ব্যাপন রোধ করে।
(vi) ইহা জারণের হার বৃদ্ধি করে।
(vii) ইহা অ্যাসিটাইলকোলিন নিউরোট্রান্সমিশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
(viii) ইহা উদ্ভিদ কোষে জেসমোনিক এসিড উৎপাদনে সাহায্য করে। জেসমোনিক এসিড রোগ প্রতিরোধে অংশ গ্রহণ করে।
(ix) ইহা কোষের অভ্যন্তরীণ স্থিতিবস্থা বজায় রাখে।

গ্লাইকোলিপিড (Glycolipid)

যে সব লিপিড ফ্যাটি এসিড, গিøসারল ও কার্বোহাইড্রেট (গ্লুকোজ) দ্বারা গঠিত তাদেরকে গ্লাইকোলিপিড বলে। ইহা গ্লাইকোক্যালিক্স হিসেবে পরিচিত। যেমন-সেরিব্রোন, নারভন ইত্যাদি।
বিভিন্ন ধরনের গ্লাইকোলিপিড হলো-
(i) সেরিব্রোসাইডঃ যে গ্লাইকোলিপিড গিøসারল, ফ্যাটি এসিড ও গ্লুকোজ বা গ্যালাক্টোজ দ্বারা গঠিত তাকে সেরিব্রোসাইড বলে। ইহা প্রাণীর মস্তিষ্কে থাকে।
(ii) সালফাটিডঃ যে গ্লাইকোলিপিড গিøসারল, ফ্যাটি এসিড ও সালফেট দ্বারা গঠিত তাকে সালফাইড বলে। ইহা বৃক্ক, যকৃত, লালাগ্রন্থি, শুক্রাশয়, ক্লোরোপ্লাস্ট প্রভৃতিতে থাকে।
(iii) গ্যাংলিওসাইডঃ যে গ্লাইকোলিপিড গিøসারল, ফ্যাটি এসিড ও অলিগোস্যাকারাইড দ্বারা গঠিত তাকে গ্যাংলিওসাইড বলে। ইহা প্রাণীর মস্তিস্ক, স্নায়ুকোষ, প্লিহা ও লোহিত রক্তকণিকায় থাকে।
গ্লাইকোলিপিডের কাজ
(i) গ্লাইকোলিপিড কোষের আন্তঃক্রিয়ায় শনাক্তকরণ হিসেবে ব্যবহার হয়।
(ii) ইহা ভাইরাস শনাক্তকরণের মাধ্যমে দেহের অনাক্রম্য সাড়া প্রদানে ভূমিকা রাখে।
(iii) ইহা ক্লোরোপ্লাস্টের মেমব্রেন গঠন করে।
(iv) সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় অংশ গ্রহণ করে।
(v) লিপিডের সাথে গ্যালাক্টোজ যুক্ত হয়ে গ্যালাক্টোলিপিড গঠন করে।
(vi) গ্লাইকোলিপিড মানুষের রক্তের গ্রুপ সৃষ্টি করে।
(vii) তুলা ও সূর্যমুখীর বীজে এই লিপিড পাওয়া যায়।
(viii) ইহা নিউরনের মায়োলিন সিথ গঠন করে।