জাইমেজ এনজাইম

যে সব এনজাইম চিনি বা সুক্রোজকে ফার্মেন্টেশন প্রক্রিয়ায় ভেঙ্গে ইথাইল অ্যালকোহল ও CO2 উৎপন্ন করে তাকে জাইমেজ বলে। ২৫-৩৭ ডিগ্রী সে. তাপমাত্রার মধ্যে এই বিক্রিয়া সম্পন্ন হয়। ১৮৯৭ সালে Edward Buchner ঈস্ট ছত্রাক থেকে জাইমেজ এনজাইম পৃথক করেন। জাইমেজের ব্যবহার বা গুরুত্ব হলো-
(i) বাণিজ্যিকভাবে অ্যালকোহল উৎপাদনে ইহা ব্যবহার হয়।
(ii) ইহা খাদ্য হজমে সাহায্য করে।
(iii) ইহা রোগীর বদহজমের ওষুধ হিসেবে ব্যবহার হয়।

সেলুলেজ এনজাইম

যে এনজাইম সেলুলোজকে ভেঙ্গে সেলুবায়োজে পরিনত করে তাকে সেলুলেজ বলে। সেলুলোজ ভাঙ্গার প্রক্রিয়াকে সেলুলোলাইসিস বলে। সেলুলেজ এনজাইমের কার্যকারীতায় মৃতদেহ পচে মাটিতে মিশে যায়। তৃণভোজী প্রাণীদের পরিপাকতন্ত্র থেকে সেলুলেজ এনজাইম ক্ষরণ হয়। মানুষের পরিপাকতন্ত্রে সেলুলেজ এনজাইম ক্ষরণ হয় না। সেলুলেজের ব্যবহার বা গুরুত্ব হলো-
(i) ইহা লন্ড্রি ডিটারজেন্ট ও ওয়াশিং পাউডারের উপাদান হিসেবে ব্যবহার হয়।
(ii) কাগজ তৈরীতে ইহা ব্যবহার হয়।
(iii) ওষুধ তৈরীতে এর ব্যবহার রয়েছে।
(iv) ইহা বস্ত্রশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
(v) কফি প্রক্রিয়াজাতকরণে ইহা ব্যবহার হয়।
(vi) পানীয় ও জুস উৎপাদনে ইহা ব্যবহার হয়।

লাইপেজ এনজইম

যে এনজাইম চর্বি বা লিপিডকে ভেঙ্গে ফ্যাটি এসিড ও গিøসারলে পরিনত করে তাকে লাইপেজ বলে। চর্বি বা লিপিড ভাঙ্গার প্রক্রিয়াকে লাইপোলাইসিস বলে। লাইপেজের ব্যবহার বা গুরুত্ব হলো-
(i) অগ্ন্যাশয়ের রোগ নির্ণয়ে লাইপেজ এনজাইম ব্যবহার হয়।
(ii) দই ও পনির তৈরীতে ইহা ব্যবহার হয়।
(iii) বেকারি ও ডিটারজেন্ট শিল্পে এর ব্যবহার রয়েছে।
(iv) দই ও পনির শিল্পে ইহা ব্যবহার হয়।
(v) খাদ্য পরিপাক ও পরিবহনে ইহা ব্যবহার হয়

অ্যামাইলেজ এনজাইম

যে এনজাইম অ্যামাইলোজকে ভেঙ্গে মল্টোজে পরিনত করে তাকে অ্যামাইলেজ বলে। ইহা দুই ধরনের। α-অ্যামাইলেজ এবং β-অ্যামাইলেজ। উদ্ভিদের বীজ, ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকে উভয় এনজাইম থাকে। মানুষের লালা ও অগ্ন্যাশয় রসে α-অ্যামাইলেজ থাকে। প্যানক্রিয়েটিক এনজাইম হলো α-অ্যামাইলেজ। বীজের অঙ্কুরোদগমের সময় β-অ্যামাইলেজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অ্যামাইলেজের ব্যবহার বা গুরুত্ব হলো-
(i) রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (PERT) চিকিৎসায় অ্যামাইলেজ এনজাইম ব্যবহার হয়।
(ii) মদ ও বিয়ার উৎপাদনে ইহা ব্যবহার হয়।
(iii) ইহা স্টার্চকে চিনিতে পরিনত করে।
(iv) ডিটারজেন্টে ইহা ব্যবহার হয়।
(v) পাউরুটি শিল্পে অ্যামাইলেজ ব্যবহার হয়।
(vi) কাপড় ও থালা-বাসন পরিষ্কার করতে অ্যামাইলেজ ব্যবহার হয়

প্রোটিয়েজ এনজাইম

যে এনজাইম প্রোটিনকে ভেঙ্গে অ্যামাইনো এসিডে পরিনত করে তাকে প্রোটিয়েজ বলে। প্রোটিন ভাঙ্গার প্রক্রিয়াকে প্রোটিওলাইসিস বলে। একে প্রোটিওলাইটিক বা সিস্টেমিক এনজাইমও বলা হয়। প্রোটিয়েজ এনজাইম প্রোটিন জাতীয় খাদ্যকে পরিপাক করে। যেমন- পেপসিন, ট্রিপসিন, ইরেপসিন, প্যাপেইন ইত্যাদি। প্রোটিয়েজের ব্যবহার বা গুরুত্ব হলো-
(i) পাউরুটির গুণগত মান উন্নয়নে প্রোটিয়েজ এনজাইম ব্যবহার হয়।
(ii) রক্ত তঞ্চন নিয়ন্ত্রণে ইহা ব্যবহার হয়।
(iii) ওষুধ তৈরীতে এর ব্যবহার রয়েছে।
(iv) ইহা প্রাণির মৃতদেহকে ভেঙ্গে পরিবেশে নাইট্রোজেন ও কার্বন মুক্ত করে।
(v) জীববিজ্ঞানের গবেষণায় প্রোটিয়েজ এনজাইম ব্যবহার হয়।

এনজাইমের প্রভাবক

১। তাপমাত্রাঃ তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে এনজাইমের কার্যকারীতা বৃদ্ধি পায়, তবে অধিক তাপে ইহা নষ্ট হয়ে যায়। এনজাইমের জন্য উত্তম তাপমাত্রা হলো ৩৫-৪০ ডিগ্রী সে.। ০ ডিগ্রী সে. তাপমাত্রায় অধিকাংশ এনজাইম নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। তাপমাত্রা ৪৫ডিগ্রী সে. এর উপরে হলে এনজাইম বিকলন বা ডিন্যাচুরেশন হয়ে যায়।
২। পানিঃ পানিশুন্য অবস্থায় এনজাইম নিষ্ক্রিয়। পানির পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে এনজাইমের ক্রিয়ার হার বৃদ্ধি পায়।
৩। pH : এনজাইমের কার্যকারীতা pH দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এনজাইমের অপটিমাম pH হলো ট্রিপসিন-৮.০, ইউরিয়েজ-৭.০, সেলুবায়েজ-৫.০, ইনভারটেজ-৪.৫, পেপসিন-২.০ প্রভৃতি।
৪। সাবস্ট্রেটের ঘনত্বঃ সাবস্ট্রেটের ঘনত্ব বাড়লে এনজাইমের ক্রিয়া বৃদ্ধি পায় এবং সাবস্ট্রেটের ঘনত্ব কমলে এনজাইমের ক্রিয়া কমে যায়।
৫। এনজাইমের ঘনত্বঃ এনজাইমের ঘনত্ব বাড়লে বিক্রিয়ার হার বৃদ্ধি পায় এবং এনজাইমের ঘনত্ব কমলে বিক্রিয়ার কমে যায়।
৬। কো-এনজাইমঃ কোন কোন কো-এনজাইমের উপস্থিতিতে এনজাইমের ক্রিয়া বৃদ্ধি পায়। যেমন- ATP, ADP, NAD, NADP, FAD, FADP প্রভৃতি।
৭। ধাতু বা ধাতবঃ ধাতুর উপস্থিতি এনজাইমের ক্রিয়া বৃদ্ধি ও হ্রাস উভয়ই ঘটে। Mg2+, Mn2+ প্রভৃতির উপস্থিতিতে এনজাইমের ক্রিয়া বৃদ্ধি পায়।
৮। জারণঃ কিছু এনজাইম বিজারণ পদার্থে সক্রিয় হয় এবং মৃদু জারক পদার্থের সংস্পর্শে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। যেমন-সালফাইড্রিল।
৯। প্রতিরোধকঃ যে সব পদার্থের উপস্থিতি এনজাইমের ক্রিয়া সাময়িক বা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয় তাকে প্রতিরোধক বা ইনহিবিটর বলে। উচ্চ শক্তির বিকিরণ, ভারী ধাতুর লবণ, সায়ানাইড, ডাই নাইট্রোফেনল, ফরমালিন প্রভৃতি হলো প্রতিরোধক।
১০। সক্রিয়কঃ সক্রিয়ক পদার্থ নিষ্ক্রিয় এনজাইমকে সক্রিয় করে। HCl এর প্রভাবে নিষ্ক্রিয় পেপসিনোজেন সক্রিয় পেপসিনে পরিনত হয়। যেমন- Cl+, Mg++, Ca++, Mn++ প্রভৃতি।
১১। সংস্পর্শঃ এনজাইম এবং সাবস্ট্রেট পরস্পরের সংস্পর্শে আসে এবং যৌগ গঠন করে। যৌগ গঠিত হলে এনজাইমের ক্রিয়া ঘটে।
১২। বিকিরণঃ উচ্চশক্তি সম্পন্ন বিকিরণ (α, β ও γ রশ্মি) এনজাইমের গাঠনিক বিচ্যুতি ঘটায় এবং কার্যক্ষমতা হ্রাস করে।
১৩। বাধক এজেন্টঃ যে সব ধাতুর উপস্থিতি এনজাইমের কার্যকারীতা বাঁধা দান করে তাকে বাধক এজেন্ট বলে। যেমন- Ag, Zn, Hg, Cu প্রভৃতি।

এনজাইমের আবেশিত মতবাদ

১৯৬৬ সালে D. Koshland এনজাইমের কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে আবেশিত মতবাদ উপস্থাপন করেন। আবেশিত মতবাদকে তালা-চাবি মতবাদের সংশোধিত সংস্করণও বলা যেতে পারে। এই মতবাদে এনজাইমের গঠন পরিবর্তনশীল। এরুপ এনজাইমকে অ্যালোস্টেরিক বলে। আবেশিত মতবাদটি আলোচনা করা হলো-
বিশেষ ধরনের প্রোটিনই হলো এনজাইম। অ্যাপো এনজাইমের যে স্থানে সাবষ্ট্রেট যুক্ত হয়ে বিক্রিয়া ঘটায় তাকে সক্রিয় স্থান বা বিক্রিয়া কেন্দ্র বলে। এনজাইমে এক বা একাধিক সক্রিয় স্থান থাকে। সাবস্ট্রেটের আকার এবং এনজাইমের সক্রিয় স্থানের আকার ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। আবেশিত মতবাদ অনুসারে, এনজাইমের সক্রিয় স্থানে যুক্ত হওয়ার জন্য সাবষ্ট্রেটের নির্দিষ্ট গঠন বা সংযোগের প্রয়োজন নাই। বরং সাবষ্ট্রেট অণুর যুক্ত হওয়ার জন্য এনজাইমের সক্রিয় স্থানের কিছুটা পরিবর্তন ঘটে। এরুপ পরিবর্তনের ফলে সক্রিয় স্থানটি সাবষ্ট্রেটের জন্য ফিট হয়ে যায়। ফলে সাবষ্ট্রেট এনজাইমের সক্রিয় স্থানে যুক্ত হয়। সাবষ্ট্রেটের সাথে যুক্ত হওয়ার পর এনজাইমটি তার সর্বোচ্চ ক্যাটালাইটিক আকৃতি ধারণ করে। এরপর সাবষ্ট্রেট ও এনজাইম হাইড্রোজেন বন্ধনী দ্বারা যুক্ত হয়ে এনজাইম-সাবষ্ট্রেট কমপ্লেক্স গঠন করে। এনজাইম-সাবষ্ট্রেট কমপ্লেক্স গঠিত হলে এনজাইম সাবষ্ট্রেটকে সহজেই ভেঙ্গে ফেলে। বিক্রিয়া শেষে উৎপাদিত পদার্থ বন্ধনী মুক্ত হয়ে দূরে সরে যায় এবং এনজাইম অপরিবর্তিত অবস্থায় মুক্ত হয়। মুক্ত এনজাইমটি নতুন বিক্রিয়ায় অংশ গ্রহণ করে।
আবেশিত মতবাদটি অনেক বিজ্ঞানীর নিকট গ্রহণ যোগ্যতা পেয়েছে। এ মডেলের স্বপক্ষে প্রমাণ হিসেবে কার্বোক্সিপেপটাইডেজ-A এবং অন্যান্য কতিপয় এনজাইমের এক্স-রে পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করা হয়েছে।
[কোশল্যান্ড (D. Koshland)-এর মতে, এনজাইমের সক্রিয় স্থানে দুইটি অংশ থাকে। বাট্রেসিং গ্রুপ এবং ক্যাটালিটিক গ্রুপ। বাট্রেসিং গ্রুপ সাবস্ট্রেটকে ধরে রাখে এবং ক্যাটালিটিক গ্রুপ সাবস্ট্রেটের বিভিন্ন বস্তুকে দুর্বল করে বিক্রিয়ালব্ধ পদার্থে পরিনত হতে সাহায্য করে]

এনজাইমের মাইকেলিস ও মেন্টেনের মতবাদ (Mykilis and Menten Theory)

১৯১৩ সালে বিজ্ঞানী মাইকেল ও মেন্টেন এনজাইমের ক্রিয়া কৌশল সম্পর্কে যে মতবাদ প্রকাশ করেন তাকে মাইকেলিস-মেনটেন মতবাদ বলে। এই মতবাদটি তালা-চাবি মতবাদের অনুরুপ। মতবাদটি আলোচনা করা হলো।
এনজাইম হলো এক ধরনের প্রোটিন যা অসংখ্য অ্যামাইনো এসিড দ্বারা গঠিত। অ্যাপো এনজাইমের যে স্থানে সাবস্ট্রেট যুক্ত হয়ে বিক্রিয়া ঘটায় সে স্থানকে Active site বা সক্রিয় স্থান বলে। প্রতিটি এনজাইমে এক বা একাধিক সক্রিয় স্থান বা বিক্রিয়া কেন্দ্র থাকে। সাবষ্ট্রেট এনজাইমের সক্রিয় স্থান বা বিক্রিয়া কেন্দ্রে যুক্ত হয়ে এনজাইম সাবষ্ট্রেট কমপ্লেক্স গঠন করে। প্রোডাক্ট সৃষ্টি হওয়ার পর এনজাইম পৃথক হয়ে যায়। এনজাইমের বিক্রিয়ার হার সাবষ্ট্রেটের ঘনত্বের সাথে সম্পর্ক যুক্ত। সাবষ্ট্রেটের ঘনত্ব বৃদ্ধির সাথে সাথে এনজাইমের ক্রিয়ার হার বৃদ্ধি পেতে থাকে। সাবষ্ট্রেটের ঘনত্ব বৃদ্ধির কারণে বিক্রিয়ার সর্বোচ্চ গতিবেগের অর্ধেক গতিবেগকে ঐ বিক্রিয়ার মাইকেলিস ধ্রুবক (Km) বলা হয়। মাইকেলিস ধ্রুবক এনজাইমের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। Km এর মান দ্বারা বিক্রিয়ার গতিবেগ নির্ধারিত হয়।

তালাচাবি মতবাদ । এনজাইমের তালাচাবি মতবাদ । Lock and Key Theory

১৮৯৮ সালে জার্মান বিজ্ঞানী ইমিল ফিশার (Emil Fisher) এনজাইমের ক্রিয়া কৌশল সম্পর্কে তালা-চাবি মতবাদ প্রকাশ করেন। এই মতবাদ অনুসারে একটি নির্দিষ্ট এনজাইম একটি নির্দিষ্ট সাবস্ট্রেটের সাথে তালা-চাবির মতো যুক্ত হয়ে এনজাইম সাবস্ট্রেট কমপ্লেক্স গঠন করে বলে এরুপ নামকরণ করা হয়েছে। তালা-চাবি মতবাদটি আলোচনা করা হলো।
এনজাইম হলো বিশেষ ধরনের প্রোটিন যা অসংখ্য অ্যামাইনো এসিড দ্বারা গঠিত। প্রতিটি এনজাইম অণু সুনির্দিষ্ট আকৃতি বিশিষ্ট হয়। এদের অ্যাপো এনজাইমের যে স্থানে সাবস্ট্রেট যুক্ত হয়ে বিক্রিয়া ঘটায় সেস্থানকে Active site বা সক্রিয় স্থান বলে। প্রতিটি এনজাইমে এক বা একাধিক সক্রিয় স্থান বা বিক্রিয়া কেন্দ্র থাকে। সাবস্ট্রেটের আকার এবং এনজাইমের সক্রিয় স্থানের আকার সব সময় একই রকম হয়। তালা-চাবি মতবাদ অনুসারে নির্দিষ্ট সাবষ্ট্রেট অণু বা অণু গুলো নির্দিষ্ট এনজাইমের সক্রিয় স্থান বা বিক্রিয়া কেন্দ্রে চাবির মতো সংযুক্ত হয়। একে induced fit বলা হয়। এরপর হাইড্রোজেন বন্ধনী দ্বারা সাবষ্ট্রেট অণু এনজাইম অণুর সাথে যুক্ত হয়ে এনজাইম সাবষ্ট্রেট কমপ্লেক্স গঠন করে। এনজাইমের একটি সক্রিয় স্থানে একটি মাত্র সাবষ্ট্রেট যুক্ত হয়। কখনো একটি সক্রিয় স্থানে একাধিক সাবষ্ট্রেট যুক্ত হতে পারে না। একটি তালা যেমন একটি নির্দিষ্ট চাবি ছাড়া খোলে না, তেমনী একটি নির্দিষ্ট এনজাইম একটি নির্দিষ্ট সাবষ্ট্রেট ছাড়া অন্য কোন সাবষ্ট্রেটের উপর ক্রিয়া করে না। এনজাইম সাবষ্ট্রেট কমপ্লেক্স গঠিত হলে এনজাইম সাবস্ট্রেটকে সহজেই ভেঙ্গে দেয় অথবা অণু গুলোর মধ্যে বন্ধনী সৃষ্টি করে বৃহৎ অণু গঠন করে। বিক্রিয়া শেষে উৎপাদিত পদার্থ বন্ধনী মুক্ত হয়ে দূরে সরে যায় এবং এনজাইম অবিকৃত ভাবে মুক্ত হয়। মুক্ত এনজাইমটি নতুন বিক্রিয়ায় অংশ নেয়।
তালা-চাবি মতবাদ অনুসারে বিক্রিয়ায় অংশ গ্রহণকারী সাবষ্ট্রেট অণুর আকৃতি অবশ্যই এনজাইমের সক্রিয় স্থান বা বিক্রিয়া কেন্দ্রে যুক্ত হওয়ার উপযুক্ত হতে হবে। এনজাইম এবং সাবস্ট্রেটের আকারের সামান্যতম পরিবর্তন হলে কার্যকারীতারও পরিবর্তন ঘটে।
আধুনিক গবেষণায় জানা গিয়েছে, কিছু কিছু এনজাইম একাধিক সাবস্ট্রেটের উপর ক্রিয়া করে। পেপিন এনজাইম ৬০-১৮০টি সাবস্ট্রেট অণুর উপর বিক্রিয়াশীল। এ কারণে অনেক বিজ্ঞানীর নিকট তালা-চাবি মতবাদ প্রশ্নবিদ্ধ।

এনজাইমের রাসায়নিক বিক্রিয়া ভিত্তিক শ্রেণীবিভাগ

রাসায়নিক বিক্রিয়ার প্রকৃতি অনুসারে এনজাইমকে ৯টি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে। এ গুলো হলো-
(i) অক্সিডোরিডাকটেজঃ যে এনজাইম কোন পদার্থের সাথে হাইড্রোজেন, অক্সিজেন কিংবা ইলেকট্রন যুক্ত করে অথবা কোন পদার্থ থেকে হাইড্রোজেন, অক্সিজেন কিংবা ইলেকট্রন মুক্ত করে তাকে অক্সিডোরিডাকটেজ এনজাইম বলে। ইহা জারণ-বিজারণ ঘটায় বলে একে জারণ-বিজারণ এনজাইমও বলা হয়। যেমন- ফসফোগ্লিসারালডিহাইড ডিহাইড্রোজিনেজ, ক্যাটালেজ, সাইটোক্রোম অক্সিডেজ, গ্লুকোঅক্সিডেজ, রিডাকটেজ প্রভৃতি।
(ii) হাইড্রোলাইটিক/হাইড্রোলেজ এনজাইমঃ যে এনজাইম কোন পদার্থের বিশেষ বন্ধনীর সাথে পানির অণুর সংযোগ ঘটিয়ে ঐ পদার্থটিকে ভাঙ্গে তাকে হাইড্রোলাইটিক এনজাইম বলে। যেমন- প্রোটিয়েজ, সুক্রেজ, ফসফেটেজ, এস্টারেজ, লাইপেজ, কার্বোহাইড্রেজ, নিউক্লিয়েজ, পেপসিন, ইনভার্টেজ, ইউরেজ, অ্যামাইলেজ, মল্টেজ, ট্রিপসিন প্রভৃতি।
(iii) ট্রান্সফারেজঃ যে এনজাইম কোন পদার্থ হতে একটি গ্রুপকে মুক্ত করে অপর একটি পদার্থের সাথে যুক্ত করে তাকে ট্রান্সফারেজ এনজাইম বলে। যেমন- হেক্সোকাইনেজ, কাইনেজ, ট্রান্স অ্যামাইলেজ, ট্রান্স অ্যাসিটাইলেজ, ডিকার্বোক্সিলেজ, মিথাইলেজ, প্রোটিন কাইনেজ, পলিমারেজ ইত্যাদি।
(iv) আইসোমারেজঃ যে এনজাইম কোন পদার্থকে তার আইসোমারে পরিনত করে তাকে আইসোমারেজ এনজাইম বলে। যেমন- ফসফোগ্লুকোআইসোমারেজ, ফসফোগ্লুকোমিউটেজ, রেসিম্যাসেজ, মিউটেজ প্রভৃতি।
(v) লাইগেজঃ যে এনজাইম ATP থেকে শক্তি নিয়ে দুই বা ততোধিক সাবস্ট্রেটকে যুক্ত করে একটি নতুন যৌগ গঠন করে তাকে লাইগেজ বলে। যেমন- গ্লুটামিক সিনথেটেজ, অ্যাসিটাইল কো-এ সিনথেটেজ, অ্যাসপারটিক সিনথেটেজ, সাকসিনিক থায়োকাইনেজ, পাইরুভিক কার্বোক্সিলেজ ইত্যাদি।
(vi) লাইয়েজঃ যে এনজাইম পদার্থের কার্বন-কার্বন, কার্বন-অক্সিজেন ও কার্বন-নাইট্রোজেন বন্ধনী বা যোজকের উপর কাজ করে তাকে লাইয়েজ বলে। যেমন- আইসোসাইট্রেট, লাইয়েজ, সাইট্রিক সিনথেটেজ, অ্যালডোলেজ, ফিউমারেজ, ডিকার্বোক্সিলেজ, ডিহাইড্রাটেজ, হাইড্রোলাইয়েজ প্রভৃতি।
(vii) কার্বোক্সিলেজঃ যে এনজাইম কোন পদার্থের সাথে CO2-কে যুক্ত করে অথবা কোন পদার্থ হতে CO2 কে মুক্ত করে তাকে কার্বোক্সিলেজ এনজাইম বলে। যেমন- কার্বোক্সিলেজ।
(viii) ফসফোরাইলেজ এনজাইমঃ যে এনজাইম কোন পদার্থের সাথে ফসফেট গ্রুপ যুক্ত করে অথবা কোন পদার্থ হতে ফসফেট গ্রুপ মুক্ত করে তাকে ফসফোরাইলেজ এনজাইম বলে। যেমন- ফসফোফ্রুক্টোকাইনেজ, ফসফোরাইলেজ, পাইরুভিক এসিড কাইনেজ প্রভৃতি।
(ix) এপিমারেজঃ যে এনজাইম কোন পদার্থকে তার এপিমারে পরিনত করে তাকে এপিমারেজ এনজাইম বলে। এপিমার অণুগুলো কেবলমাত্র একটি কার্বন পরমাণুর কনফিগারেশন দিয়ে পার্থক্য মন্ডিত হয়। যেমন- এপিমারেজ।