রিকম্বিন্যান্ট DNA ।। রোগ প্রতিরোধী জাত সৃষ্টি রিকম্বিন্যান্ট DNA এর ভূমিকা

রিকম্বিন্যান্ট DNA প্রযুক্তির মাধ্যমে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও কীটপতঙ্গ প্রতিরোধী উদ্ভিদ সৃষ্টি করা হয়েছে। বর্তমানে টমেটো মোজাইক ভাইরাস, টোবাকো মোজাইক ভাইরাস, টোবাকো মাইল্ড গ্রীন মোজাইক ভাইরাস, পেঁপের রিং স্পট, আলুর বিলম্বিত ধ্বসা প্রভৃতি প্রতিরোধী জাত সৃষ্টি করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ান বিজ্ঞানী সেয়ার Aagilops umbellulata হতে Rus+ প্রতিরোধক জিন নিয়ে Kile গমে প্রবেশ করিয়ে Rust প্রতিরোধক গমের জাত সৃষ্টি করেছেন। আমেরিকান বিজ্ঞানীরা ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক প্রতিরোধী RPS2 ও L2 জিন শনাক্ত করেছেন। এসব জিন ফসলী উদ্ভিদে প্রবেশ করানোর কাজ চলছে।

রিকম্বিন্যান্ট DNA ।। ভিটামিন সমৃদ্ধ ভূট্রার জাত সৃষ্টিতে রিকম্বিন্যান্ট DNA এর ভূমিকা ।। multivitamin corn

২০০৯ সালে স্পেনের ড. পল ক্রিস্টো ভিটামিন-সি, বিটা ক্যারোটিন ও ফলিক এসিড সৃষ্টিকারী M17W জিন ভূট্রায় প্রবেশ করে ট্রান্সজেনিক ভূট্রা সৃষ্টি করেছেন। এই ভূট্রা কোটি মানুষের ভিটামিনের চাহিদা পূরণ করছে।

পুংবন্ধত্ব উদ্ভিদ কী

সুপ্রজননের ক্ষেত্রে পুংবন্ধত্ব উদ্ভিদ প্রয়োজন হয়। ব্যাকটেরিয়ার রাইবোনিউক্লিয়েজ জিন উদ্ভিদে প্রয়োগ করে পরাগরেণু উৎপাদন বন্ধ করা হয়েছে। সরিষা, তামাক, লেটুস, কফি, তুলা, টমেটো, আলু প্রভৃতি উদ্ভিদে পুংবন্ধ্যাত্ব সৃষ্টি করা হয়েছে।

দ্যুতিময় উদ্ভিদ কী

জোনাকীর আলো উৎপাদনকারী লুসিফেরিন জিন তামাক গাছে প্রবেশ করিয়ে ট্রান্সজেনিক তামাক গাছ তৈরী করা হয়েছে। ট্রান্সজেনিক তামাক গাছ রাতে আলো বিচ্ছুরিত করে। ফলে পথিকদের পথ চলতে সুবিধা হয়।

বায়োরিয়েক্টর কী ।। Bioreactor কী

ট্রান্সজেনিক প্রাণিকে বায়োরিয়েক্টর হিসেবে ব্যবহার করে এদের দুধ, রক্ত মূত্র থেকে ওষুধ তৈরী করা হয়। একে মলিক্যুলার ফার্মিং বলে। এসব ওষুধ বহুবিধ রোগ নিরাময়ে ব্যবহার হয়।

রিকম্বিন্যান্ট DNA ।। জীবের গুণগত মান উন্নয়ন রিকম্বিন্যান্ট DNA এর ভূমিকা

(i) অস্ট্রেলিয়ায় ভেড়া পালন একটি উত্তম ব্যবসা। ভেড়াথেকে পশম ও মাংস পাওয়া যায়। ভেড়া ক্লোভার জাতীয় ঘাস খায়। ক্লোভার ঘাসে সালফারের পরিমাণ কম থাকায় পশম উন্নত হয় না। সূর্যমুখী থেকে সালফার উৎপাদনকারী জিন ক্লোভার ঘাসে প্রবেশ করে ক্লোভার ট্রান্সজেনিক ঘাস তৈরী করা হয়েছে। এই ঘাস খেয়ে ভেড়ার সালফারের অভাব পুরণ হয়েছে এবং ভেড়ার পশমের গুণগত মানের উন্নয়ন হয়েছে।
(ii) জীবপ্রযুক্তির মাধ্যমে ট্রান্সজেনিক প্রাণী সৃষ্টি করা হয়। ট্রান্সজেনিক প্রাণীর দুধ, রক্ত ও মূত্র থেকে ওষুধ তৈরী করা হয়।
(iii) ল্যাক্টোফেরিন এনজাইমের অভাবে গরুর বাটে ম্যাস্টাইটিস রোগ হয় এবং দুধের উৎপাদন কমে যায়। ষাঁড় গরুতে ল্যাক্টোফেরিন প্রবেশ করিয়ে ট্রান্সজেনিক ষাঁড় সৃষ্টি করা হয়। এই ট্রান্সজেনিক ষাঁড়ের বংশধর ম্যাস্টাইটিস প্রতিরোধী হয়।
(iv) মানুষের বৃদ্ধি হরমোনের জিন ভেড়ায় প্রবেশ করিয়ে অধিক বৃদ্ধিশীল ভেড়া উৎপাদন করা হয়েছে।
(v) স্যালমন, ট্রাউট ও পোনা মাছে সামুদ্রিক মাছের জিন ঢুকিয়ে অধিক বৃদ্ধিশীল মাছ উদ্ভাবন করা হয়েছে। স্যালমন এর বৃদ্ধি ৩০ গুণ বেশি হয়েছে।
(vi) গাভীতে বোভাইন সোমাটোট্রপিন প্রয়োগ করে দুগ্ধ উৎপাদন বৃদ্ধি করা হয়েছে।

রিকম্বিন্যান্ট DNA ।। ফ্লেভার সেভার টমেটো সৃষ্টিতে রিকম্বিন্যান্ট DNA এর ভূমিকা

জঙ্গি জাতের টমেটো (Lycopersicon escolentum) থেকে PG জিন সংগ্রহ করে আধুনিক জাতের টমেটোতে (Lycopersicon lycopersicum) প্রবেশ করিয়ে ফ্লেভার সেভার টমেটো (CGN-89564-2) সৃষ্টি করা হয়েছে। এই টমেটোর স্বাদ ও গন্ধ উন্নত। ইহা পাকে দেরীতে, সহজে পচে না এবং দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়। এছাড়া উদ্ভাবন করা হয়েছে ব্রিটিশ জেনেকা টমেটো।

সুপার রাইস ।। গোল্ডেন রাইস ।। রিকম্বিন্যান্ট DNA ।। Super rice

গোল্ডেন বা সোনালী বর্ণের চাউলকে গোল্ডেন বা সুপার রাইস বলা হয়। ২০০০ সালে সুইস ফেডারেল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির বিজ্ঞানী ইনগো পোট্রাইকাস (Ingo Potrykus) এবং জার্মানীর ফ্রিইবার্গ বিশ^বিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী পিটার বায়ার (Peter Beyer) যৌথভাবে গোল্ডেন রাইস উদ্ভাবন করেন।  তাঁরা ড্যাফোডিল উদ্ভিদ থেকে বিটা ক্যারোটিন উৎপাদনকারী চারটি psy (phytoene synthase) জিন, আয়রন উৎপাদনকারী তিনটি জিন এবং Erwinia uredovora ব্যাকটেরিয়া থেকে crtI (carotene desaturase) জিন নিয়ে Japonica ধানে প্রবেশ করে সুপার রাইস তৈরী করেছেন। এই ধানের ভাত খেলে রাত কানা রোগ হয় না। ছাড়া মায়েদের দেহে রক্তশুন্যতাও হয় না। ২০০৫ সালে গোল্ডেন রাইস উদ্ভাবন করা হয়েছে যা থেকে ২৩ গুণ বেশি বিটা ক্যারোটিন পাওয়া যায়। বাংলাদেশসহ এশিয়া, আফ্রিকা ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের ছোট ছেলে মেয়েদের ভিটামিন এর অভাব রয়েছে। ভিটামিন এর অভাবে রাতকানা রোগ হয়।

রিকম্বিন্যান্ট DNA ।। পতঙ্গরোধী উদ্ভিদ সৃষ্টিতে রিকম্বিন্যান্ট DNA এর ভূমিকা

(i) Bacillus ব্যাকটেরিয়া থেকে একটি জিন নিয়ে আমেরিকান তুলা গাছে প্রবেশ করিয়ে ট্রান্সজেনিক তুলা গাছ তৈরী করা হয়েছে। এই ট্রান্সজেনিক তুলা গাছে এক প্রকার বিষাক্ত প্রোটিন উৎপন্ন হয়। এ কারণে পোকার আক্রমণ ঘটে না। ফলে তুলার উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় কমেছে এবং পরিবেশ দুষণ রোধ হয়েছে।
(ii) বর্তমানে আলু, আপেল, তুলা, গম প্রভৃতি পতঙ্গরোধী উদ্ভিদ উদ্ভাবন করা হয়েছে। এসব উদ্ভিদে Bt toxin জিন এবং CpTi জিন স্থাপন করা হয়েছে। পোকা এসব উদ্ভিদের পাতা ভক্ষণ করলে ২৪ ঘন্টার মধ্যে মারা যায়।
(iii) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি শুঁয়াপোকা নিরোধক তুলার বীজ উৎপন্ন করেছে। এর ফলে তুলা চাষে কীটজনিত অসুবিধা দূর হয়েছে।
(iv) Bacillus thuringiensis ব্যাকটেরিয়া থেকে ক্রাই (cry) জিন পৃথক করে উদ্ভিদে প্রবেশ করিয়ে পতঙ্গ প্রতিরোধী উদ্ভিদ সৃষ্টি করা হয়েছে। Bt বেগুন, Bt তুলা, Bt রাইস, Bt কর্ণ, Bt আলু, Bt আপেল প্রভৃতি ট্রান্সজেনিক উদ্ভিদ পতঙ্গ প্রতিরোধী।
(v) ইউরোপিয়ান কর্নবোরা মথের লার্ভার আক্রমণে ভূট্রার ব্যাপক ক্ষতি হয় এবং ফলন ৪০% কমে যায়। ব্যাকটেরিয়া থেকে বিষাক্ত প্রোটিন উৎপাদনকারী জিন ভূট্রা গাছে প্রবেশ করিয়ে ট্রান্সজেনিক ভূট্রা সৃষ্টি করা হয়েছে। এই ভূট্রা কর্নবোরা দ্বারা আক্রান্ত হয় না। এখন ভূট্রা চাষে কীটনাশক প্রয়োগ করতে হয় না। এতে ভূট্রার ফলন বৃদ্ধি পেয়েছে, উৎপাদন খরচ কমেছে এবং পরিবেশ দূষণ রোধ হয়েছে।
(vi) Bacillus thuringiensis ব্যাকটেরিয়া থেকে বিষাক্ত পদার্থ উৎপন্নকারী জিন নিয়ে Rhyzobium-এ প্রবেশ করানো হয়েছে। Rhyzobium শিম জাতীয় উদ্ভিদের মূলে নডিউল বা অর্বুদ সৃষ্টি করে। নডিউল বা অর্বুদ যুক্ত শিম উদ্ভিদ উইভিল জাতীয় ক্ষতিকারক পতঙ্গের আক্রমণ রোধ করতে পারে।
(vii) Bacillus thuringiensis ব্যাকটেরিয়া থেকে জিন নিয়ে তুলা গাছে প্রবেশ করিয়ে Bt toxin জিন সৃষ্টি করা হয়েছে। Bt toxin জিন বিশিষ্ট তুলা গাছ ভক্ষণ করে লেপিডোপটেরা, বিটল, মাছি, মশা প্রভৃতি পতঙ্গ মারা গিয়েছে।
(viii) স্টেরাইল ইনসেক্ট টেকনিক (SIT) একটি আধুনিক পদ্ধতি। এটি একটি পরিবেশ বান্ধব ক্ষতিকর পতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে ক্ষতিকর পতঙ্গের পুরুষগুলোকে বন্ধ্যা করে দেওয়া হয়। ফলে নতুন প্রজন্ম বিকশিত হয় না। ব্রাজিল, জাপান, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র প্রভৃতি দেশে এই প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে।

রিকম্বিন্যান্ট DNA ।। উচ্চ ফলনশীল জাত সৃষ্টিতে রিকম্বিন্যান্ট DNA এর ভূমিকা

বন্য প্রজাতি থেকে কাক্সিক্ষত জিন নিয়ে ফসলী উদ্ভিদে প্রবেশ করিয়ে উচ্চ ফলনশীল জাত সৃষ্টি করা হয়েছে। ড্যাফোডিল উদ্ভিদ থেকে বিটা ক্যারোটিন ও আয়রন উৎপন্নকারী জিন নিয়ে ধান, গম, ভূট্রা, সয়াবিন, আলু, টমেটো, পেঁপে, রাই, সূর্যমুখী, নাসপাতি, আঙ্গুর প্রভৃতি উদ্ভিদে প্রবেশ করিয়ে উচ্চ ফলনশীল জাত সৃষ্টি করা হয়েছে।