প্লীহা কী । ব্লাড ব্যাংক কী । Spleen । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

প্লীহা হলো মানবদেহের সবচেয়ে বড় লসিকা গ্রন্থি। ইহা পাঁজরের নিচে এবং পাকস্থলীর উপরে অবস্থান করে। ইহা নরম এবং কালচে বর্ণের। একে রক্তে রিজার্ভার বা ব্লাড ব্যাংক বলা হয়। ইহা দুই ধরনের প্লীহা মজ্জা নিয়ে গঠিত। লাল মজ্জা ও সাদা মজ্জা।  ইহা ৩০০ মিলি রক্ত জমা রাখতে পারে। প্লীহার আয়তন ১৩××৩ ঘন সেমি এবং ওজন ১৫০ গ্রাম। প্লীহা রক্তের প্রধান ছাঁকুনী হিসেবে কাজ করে। অধিকাংশ লোহিত রক্তকণিকা প্লীহায় ধ্বংস প্রাপ্ত হয় বলে একে লোহিত রক্তকণিকার কবরস্থান বলা হয়। ইহা জীবাণু ধ্বংস করে রোগ প্রতিরোধ করে।

লসিকা পর্ব/গ্রন্থি কী । Lymphatic gland । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

লসিকা নালিতে যে ডিম্বাকার স্ফীত অংশ থাকে তাকে লসিকা পর্ব বা লসিকা গ্রন্থি বলে। লসিকা গ্রন্থির সংখ্যা ৪০০-৭০০।  গ্রন্থিগুলো গ্রীবা, বগল ও কুঁচকিতে সবচেয়ে বেশি থাকে।

সিরাম কী । Serum । সেরোলজি  কী । Serology । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

রক্ত জমাট বাঁধার পর যে হলুদ তরল পদার্থ থাকে তাকে সিরাম বলে। অণুচক্রিকাতে সেরোটনিন থাকে। অণুচক্রিকা ভেঙ্গে যাওয়ায় সেরোটনিন সিরামে চলে যায়। ইহা রক্তরসের মতোই। এতে সেরাটোনিন থাকে যা রক্ত নালিকার সঙ্কোচন ঘটায়। জীববিজ্ঞানের যে শাখায় সিরাম নিয়ে আলোচনা করা হয় তাকে সেরোলজি (Serology) বলে। সিরামে ফাইব্রিনোজেন, প্রোথ্রম্বিন, ল্যাবাইল ও অ্যান্টিহিমোফিলিক ফ্যাক্টরগুলো থাকে না।

রক্তনালিতে রক্ত জমাট বাঁধে না কেন । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

১। রক্ত সর্বদা প্রচন্ড গতিতে প্রবাহমান থাকে।

২। রক্তে ৫০ ধরণের প্রোকোয়াগুলেন্ট ফ্যাক্টর (রক্ত জমাট বাঁধায়) এবং অ্যান্টিকোয়াগুলেন্ট ফ্যাক্টর (জমাট বাঁধা প্রতিরোধ করে) থাকায়।

৩। রক্ত নালিকার প্রাচীর খুব মসৃণ হওয়ায়।

৪। অ্যান্টিকোয়াগুলেন্ট ফ্যাক্টরে হেপারিন ও থ্রম্বোমডিউলিন থাকে যা রক্ত জমাট বাঁধা প্রতিরোধ।

৫। সক্রিয় কোয়াগুলেন্ট ফ্যাক্টর গুলো সর্বদা যকৃত দ্বারা অপসারিত হওয়ায়।

 রক্ত জমাট বাঁধার ফ্যাক্টরগুলো কী কী । Factors of Blood Clotting । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

১। ফ্যাক্টর-I বা ফাইব্রিনোজেনঃ ফাইব্রিনোজেন হলো গ্লোবিউলিন জাতীয় প্রোটিন। ইহা রক্ত তঞ্চনের সময় ফাইব্রিনে পরিনত হয়।

২। ফ্যাক্টর-II বা প্রোথ্রম্বিনঃ প্রোথ্রম্বিন হলো প্লাজমা প্রোটিন। রক্ত তঞ্চনের সময় ইহা থ্রম্বিনে পরিনত হয়।

৩। ফ্যাক্টর-III বা থ্রম্বোপ্লাস্টিনঃ ভাঙ্গা অণুচক্রিকা থেকে থ্রম্বোপ্লাস্টিন নিঃসৃত হয়। ইহা ক্যালসিয়াম আয়নের উপস্থিতিতে প্রোথ্রম্বিনকে থ্রম্বিনে পরিনত করে।

৪। ফ্যাক্টর-IV বা ক্যালসিয়ামঃ ক্যালসিয়াম আয়ন থ্রম্বোপ্লাস্টিন উৎপাদনে সাহায্য করে। ইহা প্রোথ্রম্বিনকে থ্রম্বিনে পরিনত করে।

৫। ফ্যাক্টর-V বা ল্যাবাইলঃ ল্যাবাইল হলো প্লাজমায় অবস্থিত প্রোটিন জাতীয় পদার্থ। ইহা প্রোথ্রম্বিনকে থ্রম্বিনে পরিনত করে।

৬। ফ্যাক্টর-VI বা অ্যাক্সিলারিনঃ এটি লেবাইল ফ্যাক্টর নামে পরিচিত।

৭। ফ্যাক্টর-VII বা প্রোকনভার্টিনঃ বর্তমানে প্রোকনভার্টিন এর অস্তিক্ত নাই। এটি প্রকল্পিত।

৮। ফ্যাক্টর-VIII বা অ্যান্টিহিমোফিলিকঃ অ্যান্টিহিমোফিলিক হলো প্লাজমায় অবস্থিত প্রোটিন জাতীয় পদার্থ। ইহা থ্রম্বোপ্লাস্টিন উৎপাদনে সাহায্য করে।

৯। ফ্যাক্টর-IX বা ক্রিস্টমাসঃ ক্রিস্টমাস হলো প্লাজমায় অবস্থিত প্রোটিন জাতীয় পদার্থ। ইহা থ্রম্বোপ্লাস্টিন উৎপাদনে সাহায্য করে।

১০। ফ্যাক্টর-X বা স্টুয়ার্টঃ স্টুয়ার্ট এর অভাবে রক্ত জমাট বাঁধা ব্যাহত হয়।

১১। ফ্যাক্টর-XI বা প্লাজমা থ্রম্বোপ্লাস্টিনঃ ইহা এক প্রকার প্রোটিন। ইহা থ্রম্বোপ্লাস্টিন গঠনে অংশ নেয়।

১২। ফ্যাক্টর-XII বা হেগম্যানঃ হেগম্যান ক্যালিক্রেইনকে সক্রিয় করে। ইহা প্লাজমাকাইনিন নামক পদার্থ সৃষ্টি করে। প্লাজমাকাইনিন রক্তনালির ভেদ্যতা ও সম্প্রসারণশীলতা বৃদ্ধি করে।

১৩। ফ্যাক্টর-XIII বা স্টেবিলাইজিংঃ স্টেবিলাইজিং ক্যালসিয়াম আয়নের সহযোগিতায় নরম তঞ্চন পিন্ডকে অদ্রবনীয় কঠিন তন্তুতে রুপান্তরিত করে।

রক্ত তঞ্চনকাল । রক্ত জমাট বাঁধার সময়কাল । Blood clotting period । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

দেহ থেকে নির্গত রক্ত জমাট বাঁধতে যে সময় লাগেতাকে রক্ত তঞ্চনকাল বলে। মানুষের স্বাভাবিক রক্ত ক্ষরণ কাল ১-৪ মিনিট। রক্ত তঞ্চনকাল ৪-৫ মিনিট। এ সময়ের মধ্যে রক্ত জমাট না বাঁধলে ধরে নিতে হবে, যে কোন এক বা একাধিক ফ্যাক্টর অনুপস্থিত রয়েছে। যে কোন তঞ্চন ফ্যাক্টর অনুপস্থিত থাকলে ক্ষত স্থান থেকে প্রচুর রক্ত ক্ষরণ হয়। একে হিমোফিলিয়া বলে।

রক্ত জমাট বাঁধার কৌশল আলোচনা । Blood Clotting । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

দেহের ক্ষত স্থানে লোহিত রক্তকণিকা, শে^ত রক্তকণিকা, রক্তের তরল অংশ ও অন্যান্য উপাদান আটকে যায এবং রক্ত প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। একে রক্ত জমাট বাঁধা বা রক্ত তঞ্চন বলে। রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়াকে হিমোস্টেসিস বলে। হিমোস্টেসিস প্রক্রিয়ার ধাপগুলো হলো-

১। রক্ত নালিকার ভিতরে হেপারিন ও থ্রম্বোমডিউলিন থাকে বলে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে না। দেহের কোথায়ও ক্ষত সৃষ্টি হলে রক্ত বাইরে বেরিয়ে আসে এবং ক্ষত স্থানে রক্তের অণুচক্রিকা বাতাসের সংস্পর্শে ভেঙ্গে যায়। অণুচক্রিকা ভেঙ্গে থ্রম্বোপ্লাস্টিন সৃষ্টি করে। থ্রম্বোপ্লাস্টিন রক্তের হেপারিনকে নিষ্ক্রিয় বা অকেজো করে দেয়।

ক্ষত স্থানের কলা বিদীর্ণ ও অণুচক্রিকার ভাঙ্গন + বাতাস ——-→ থ্রম্বোপ্লাস্টিন

২। ক্যালসিয়াম আয়ন এবং VII, VIII, IX ফ্যাক্টর ও X এর উপস্থিতিতে  থ্রম্বোপ্লাস্টিন রক্তের নিষ্ক্রিয় প্রোথ্রম্বিনকে সক্রিয় থ্রম্বিনে পরিনত করে।

থ্রম্বোপ্লাস্টিন  +  Ca++  +  প্রোথ্রম্বিন ———→   থ্রম্বিন

৩। সক্রিয় থ্রম্বিন রক্তের ফাইব্রিনোজেন প্রোটিনকে চিকন সুতার মতো ফাইব্রিন সূত্রকে পরিনত করে।

থ্রম্বিন + ফাইব্রিনোজেন —–→ ফাইব্রিন সূত্রক

৪। ফাইব্রিন সূত্রক গুলো পরস্পর মিলিত হয়ে ফাইব্রিন জালক গঠন করে। ফাইব্রিন জালক হলো ফাইব্রিন পলিমার।

ফাইব্রিন সূত্রক —–→  ফাইব্রিন জালক

৫। ফাইব্রিন জালকে লোহিত রক্তকণিকা, শে^ত রক্তকণিকা ও রক্তের তরল অংশ আটকে যায়। ফলে রক্ত প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং রক্ত জমাট বেঁধে যায়। লোহিত রক্তকণিকা আটকে যায় বলে রক্ত জমাটটি লালচে বর্ণের দেখায়।

ফাইব্রিন জালক + রক্তকণিকা আটক   ———→   রক্ত জমাট বাঁধা

৬। রক্তবাহিকার পুনর্গঠন শুরু হলে প্লাজমিন এনজাইম ফাইব্রিন জালককে ধ্বংস করে দেয়। ফলে নতুন টিস্যু সৃষ্টি হয়। ধীরে ধীরে ক্ষত পূরণ হয়ে যায়।

হিমোস্টেসিস কী । রক্ত জমাট বাঁধার কৌশল । Blood Clotting । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

দেহের ক্ষত স্থানে লোহিত রক্তকণিকা, শে^ত রক্তকণিকা, রক্তের তরল অংশ ও অন্যান্য উপাদান আটকে যায এবং রক্ত প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। একে রক্ত জমাট বাঁধা বা রক্ত তঞ্চন বলে। রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়াকে হিমোস্টেসিস বলে।

লসিকার কাজ কী কী । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

১। খাদ্যসার পরিবহনঃ  লসিকা অ্যামাইনো এসিড, গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ, ফ্যাটি এসিড, গিøসারল প্রভৃতি কোষে পরিবহন করে।

২। অক্সিজেন পরিবহনঃ  লসিকা অক্সিজেনকে দেহের বিভিন্ন অংশে পৌছে দেয়।

৩। কার্বন ডাই অক্সাইড পরিবহনঃ ইহা কার্বন ডাই অক্সাইডকে দেহের বিভিন্ন অংশ হতে হৃৎপিন্ডে নিয়ে আসে।

৪। খাদ্য শোষণঃ  ইহা চর্বি জাতীয় খাবার শোষণ করে।

৫। ভিটামিন পরিবহনঃ  লসিকার মাধ্যমে ভিটামিন পরিবাহিত হয়।

৬। রোগ প্রতিরোধঃ ইহা অ্যান্টিবডি তৈরীর মাধ্যমে দেহকে রোগ প্রতিরোধী করে।

৭। জীবাণু ধ্বংসঃ  দেহে কোন জীবাণু প্রবেশ করলে লসিকা ফ্যাগোসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় জীবাণু ভক্ষণ করে দেহকে রক্ষা করে।

৮। তাপমাত্রা সমতাঃ  রক্তের মাধ্যমে দেহের সর্বত্র তাপের সমতা নিয়ন্ত্রিত হয়।

৯। লিপিড পরিবহনঃ  লসিকার মাধ্যমে লিপিড পরিবাহিত হয়।

১০। প্রতিরক্ষাঃ  লসিকায় লিম্ফোসাইট মনোসাইট থাকে। লিম্ফোসাইট মনোসাইট প্রতিরক্ষা অবদান রাখে।

১১। লিপিড পরিবহনঃ  লসিকার মাধ্যমে লিপিড পরিবাহিত হয়।

১২। দেহরসের পুনর্বন্টনঃ  লসিকা দেহের এক অংশ থেকে তরল পদার্থ অন্য অংশে পরিবহন করে। ফলে দেহ রসের পুনর্বন্টন ঘটে।

লসিকা নালি কী । লসিকা নালিরপ্রকরভেদ। Lymph vessels । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

যে সব নালির মধ্য দিয়ে লসিকা রস পরিবাহিত হয় তাকে লসিকা নালি বলে। ইহা বদ্ধ প্রান্তবিশিষ্ট সুক্ষ্ম নালিকা। অন্ত্রের প্রাচীরের লসিকা নালিকে ল্যাকটিয়েল বলে। লসিকা শুধু এক দিকে ধীরগতিতে প্রবাহিত হয়।

সুক্ষ্ম লসিকানালি গুলো মিলিত হয়ে দুইটি বড় নালি গঠন করে। যথা-

১। ডান লসিকানালিঃ মাথা, গলার ডান দিক, ডান বাহু এবং ডান বক্ষে অবস্থিত লসিকানালি গুলো মিলিত হয়ে ডান লসিকানালি গঠন করে। ইহা ডান সাবক্লাভিয়ান শিরা ও ডান অন্তঃজুগুলার শিরার সংযোগস্থলে যুক্ত থাকে।

২। থোরাসিক লসিকানালিঃ দেহের নিম্নাংশ এবং বাম দিকের লসিকানালি গুলো মিলিত হয়ে থোরাসিক লসিকানালি গঠন করে। ইহা বাম সাবক্লাভিয়ান শিরা ও বাম অন্তঃজুগুলার শিরার সংযোগস্থলে যুক্ত থাকে।