রুই মাছের পাখনার প্রকারভেদ । Fins of rohi fish । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

রুই মাছে জোড়/যুগ্ন ও বিজোড়/অযুগ্ন পাখনা থাকে। প্রতিটি পাখনায় অস্থিময় পাখনারশ্মি থাকে। এতে পাঁচ ধরণের পাখনা থাকে। যথা-

১। বক্ষ পাখনাঃ কানকোর পিছনে একজোড়া বক্ষ পাখনা আছে। এতে ১৬-১৯টি পাখনা রশ্মি থাকে। ইহা মাছকে পানির উপরের দিকে উঠতে সাহায্য করে।

২। পৃষ্ঠ পাখনাঃ দেহের পৃষ্ঠদেশে একটি পৃষ্ঠ পাখনা আছে। এতে ১৪-১৬টি পাখনা রশ্মি থাকে। ইহা মাছকে ঘুরতে এবং থেমে যেতে সাহায্য করে।

৩। শ্রেণী পাখনাঃ দেহের অঙ্কীয়তলে মধ্যভাগে একজোড়া শ্রেণী পাখনা আছে। এতে ৭-৯টি পাখনা রশ্মি থাকে। ইহা মাছকে উপরে ও নিচে ঘুরতে এবং থেমে যেতে সাহায্য করে।

৪। পায়ু পাখনাঃ দেহের অঙ্কীয়তলে পায়ুর পিছনে একটি পায়ু পাখনা আছে। এতে ৪-৭টি পাখনা রশ্মি থাকে। ইহা মাছকে সুস্থির রাখতে সাহায্য করে।

৫। পুচ্ছ পাখনাঃ লেজের পিছনে একটি পুচ্ছ পাখনা আছে। ইহা দুটি অংশে বিভক্ত এবং হোমোসার্কাল। এতে ১৯টি পাখনা রশ্মি থাকে। ইহা মাছের প্রধান চলন অঙ্গ হিসেবে কাজ করে।

মাছের বয়স নির্ণয়ে সাইক্লয়েড আঁইশের ভূমিকা । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

সাইক্লয়েড আঁইশ দেখতে গোলাকার বা ডিম্বাকার এবং রুপালী সাদা বর্ণের। এর কেন্দ্রে ফোকাস বা নিউক্লিয়াস থাকে। ইহাতে দুই ধরনের রেখা থাকে। সারকুলাস রেখা এবং অ্যানুলাস রেখা। আঁইশের মাসিক রেখাকে সারকুলাস রেখা বলে। ইহা ছোট এবং অস্পষ্ট।  আঁইশের বাৎসরিক রেখাকে অ্যানুলাস রেখা বলে। ইহা বড় এবং স্পষ্ট।  সাইক্লয়েড আঁইশে প্রতি বছর একটি করে অ্যানুলাস রেখা সৃষ্টি হয়। সারকুলাস রেখা হিসাব করে মাস এবং অ্যানুলাস রেখা হিসাব করে বছর নির্ণয় করা যায়। আঁইশে অ্যানুলাস রেখা ১টি থাকলে ১ বছর, ২ টি থাকলে ২ বছর হিসাব করা হয়। এভাবে অ্যানুলাস ও সারকুলাস রেখা গণনা করে মাছের বয়স নির্ণয় করা হয়। রুই মাছ সর্বোচ্চ ১০ বছর বাঁচে। তাই এর আঁইশে অ্যানুলাস রেখা সর্বোচ্চ ১০ টি থাকতে পারে।

মাছের আঁইশের সংজ্ঞা ও কাজ । Scale। ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

মাছের দেহ যে গোলাকার বা ডিম্বাকার, শক্ত ও পাতলা আবরণী দ্বারা আবৃত থাকে তাকে আঁইশ বলে। মাছের প্রধান প্রতিরক্ষা অঙ্গ হলো আঁইশ। ইহা ত্বকের ডার্মাল স্তর থেকে সৃষ্টি হয়। মাছের বিভিন্ন ধরনের আঁইশ হলো সাইক্লয়েড আঁইশ, প্ল্যাকয়েড আঁইশ, গ্যানয়েড আঁইশ, টিনয়েড আঁইশ প্রভৃতি।

আঁইশের কাজ বা ভূমিকা

১। আঁইশ মাছের প্রধান রক্ষাকারী অঙ্গ হিসেবে কাজ করে।

২। ইহা মাছের চলনের সময় পানির বাঁধা হ্রস করে।

৩। আঁইশে বিদ্যমান মিউকাস জীবাণু ধ্বংস করে মাছকে রোগ প্রতিরোধী করে।

৪। পাশর্^রেখায় বিদ্যমান আঁইশ পানির কম্পাঙ্ক নির্ণয় করে সংবেদ গ্রহণ করে।

৫। আঁইম মাছের শ্রেণীবিন্যাস, বয়স, বৃদ্ধির হার, জীবন ইতিহাস প্রভৃতি নির্ণয়ে ভূমিকা রাখে।

সাইক্লয়েড আঁইশ কী, এর গঠন । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

মাছের যে আঁইশ গুলো গোলাকার বা ডিম্বাকার, বৃদ্ধিরেখা যুক্ত এবং কিনারা মসৃন তাকে সাইক্লয়েড আঁইশ বলে। রাসায়নিক ভাবে আঁইশগুলো চুন ও কোলাজেন তন্তু দিয়ে গঠিত। বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে আঁইশের অধিক বৃদ্ধি ঘটে। সাইক্লয়েড আঁইশ তিনটি অংশ নিয়ে গঠিত। অংশগুলো হলো-

১। অগ্রক্ষেত্রঃ আঁইশের সামনের অংশকে অগ্রক্ষেত্র বলে। ইহা দেহের ভিতরের অংশ এবং ডার্মিসের পকেটে প্রবিষ্ট থাকে। অগ্রক্ষেত্র তন্তুময় যোজক কলা নির্মিত। অগ্রভাগে যে লম্বালম্বি খাঁজ দেখা যায় তাকে radii বলে।

২। পশ্চাৎক্ষেত্রঃ আঁইশের বাইরের দিকের উন্মুক্ত অংশকে পশ্চাদক্ষেত্র বলে। ইহা ডেন্টিন নির্মিত।

৩। পার্শ্বক্ষেত্রঃ আঁইশের দুপাশের অংশকে পার্শ্বক্ষেত্র বলে।

মাছের আঁইশ কী । Scale । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

মাছের দেহ যে গোলাকার বা ডিম্বাকার, শক্ত ও পাতলা আবরণী দ্বারা আবৃত থাকে তাকে আঁইশ বলে। মাছের প্রধান প্রতিরক্ষা অঙ্গ হলো আঁইশ। ইহা ত্বকের ডার্মাল স্তর থেকে সৃষ্টি হয়। মাছের বিভিন্ন ধরনের আঁইশ হলো সাইক্লয়েড আঁইশ, প্ল্যাকয়েড আঁইশ, গ্যানয়েড আঁইশ, টিনয়েড আঁইশ প্রভৃতি।

সংবেদী পার্শ্বরেখার কাকে বলে, এর কাজ ।। Lateral line । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

মাছের দেহের দুপাশে অগ্রভাগ হতে লেজ পর্যন্ত দুটি পার্শ্বরেখা থাকে। এতে সংবেদী কোষ থাকে বলে একে সংবেদী পার্শ্বরেখা বলে। ইহা কেমোরিসেপ্টর বা রসায়ন গ্রাহক হিসেবে কাজ করে।

সংবেদী পার্শ্বরেখার গুরুত্ব

১। এর দ্বারা মাছ পানির pH নির্ণয় করতে পারে।

২। ইহা মাছকে পানির গভীরতা নির্ণয়ে সাহায্য করে।

৩। এই রেখার সাহায্যে মাছ পানির ঘোলাত্ব বুঝতে পারে।

৪। বাইরের পরিবেশ হতে উদ্দীপনা  গ্রহণ করে।

৫। ইহা শত্রæর হাত থেকে বাঁচতে সাহায্য করে।

রুই মাছের বাহ্যিক গঠন । Labeo Ruhita External structure । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

রুই মাছ দেখতে লম্বা, চাপা ও মাকু আকৃতির। এরুপ গঠনকে স্ট্রিমলাইনড্ বলে। ইহা রুপালী সাদা বর্ণের। এরা লম্বায় তিন ফুটের বেশি এবং ওজনে ২০-২৫ কেজি হতে পারে। রুই মাছের দেহ তিনটি অংশ নিয়ে গঠিত। মস্তক, দেহকান্ড  ও  লেজ

১। মস্তকঃ দেহের অগ্রপ্রান্ত হতে কানকো পর্যন্ত অংশকে মস্তক বলে। মস্তকের পৃষ্ঠদেশ উত্তল, মসৃণ ও আঁইশবিহীন। মস্তকের সামান্য নিচে অর্ধ গোলাকার মুখ ছিদ্র থাকে। মুখছিদ্র মাংসাল ঠোট দ্বারা পরিবেষ্টিত। মুখছিদ্রের দুপাশে সুতার মতো সংবেদী ম্যাক্সিলারী বার্বেল থাকে। মাথার দুপাশে দুটি চোখ থাকে। চোখে পল্লব থাকে না। চোখের সামনে একটি করে নাসাছিদ্র থাকে। প্রতি পাশে একটি করে নড়নক্ষম বৃহৎ কানকো থাকে। কানকোর নিচে চারটি করে চিরুনির মতো ফুলকা থাকে। কানকোর মুক্ত প্রান্তে পাতলা ব্রাংকিওস্টিগাল পর্দা থাকে।

২। দেহকান্ডঃ মাছের কানকোর পিছন থেকে পায়ু পর্যন্ত অংশকে দেহকান্ড বলে। ইহা দেহের সবচেয়ে বড় অংশ। দেহকান্ডের দুপাশে অগ্রভাগ হতে লেজ পর্যন্ত দু’টি পার্শ্বরেখা থাকে। এতে সংবেদী কোষ থাকে বলে একে সংবেদী পার্শ্বরেখা বলে। এতে অসংখ্য পার্শ্বরেখা অঙ্গ বা নিউরোমাস্ট থাকে। রুই মাছের দেহে জোড় ও বিজোড় পাখনা থাকে। এগুলো হলো- একজোড়া বক্ষ পাখনা, একজোড়া শ্রোণী পাখনা, একটি বৃহৎ পৃষ্ঠ পাখনা এবং একটি পায়ু পাখনা। কান্ড পাতলা সাইক্লয়েড আঁইশ দ্বারা আবৃত থাকে। দেহের অংকীয় তলে তিনটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্র থাকে। পায়ুছিদ্র, জননছিদ্র ও রেচনছিদ্র।

৩। লেজঃ পায়ু হতে দেহের শেষ প্রান্তকে লেজ বলে। লেজের শেষ প্রান্তে হোমোসার্কাল পুচ্ছ পাখনা থাকে। ইহা দুটি অংশে বিভক্ত। উর্ধ্ব-প্রতিসম এবং অধ-প্রতিসম। লেজে ৬টি পাখনারশ্মি থাকে। পুচ্ছ পাখনাই মাছের একমাত্র চলন অঙ্গ।

 

রুই মাছ স্বভাব ও বাসস্থান । Labeo rohita । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

বাংলাদেশ, ভারত মায়ানমারের হ্রদ, নদনদী, হাওরবাওর, খালবিল, পুকুর প্রভৃতি জলাশয়ে প্রচুর পরিমাণে রুই পাওয়া যায়। এরা পানির মধ্যস্তরে বাস করে। রুই মাছ ১৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রার নিচে বাঁচে না। এর বৃদ্ধির সর্বোত্তম তাপমাত্রা হলো ৩০৩২ ডিগ্রী সেলসিয়াস।

রুই মাছ সর্বভূক প্রাণী। রেণুপোনা জ্যুওপ্ল্যাঙ্কটন এবং আঙ্গুলিপোনা ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন খায়। পূর্ণ বয়স্ক মাছ শৈবাল নরম উদ্ভিদ খায়। বাণিজ্যিকভাবে চাষকৃত রুই মাছের খাদ্য হলো চালের কুঁড়া, গমের ভুষি, সরিষার খৈল, অন্যান্য সম্পূরক খাদ্য প্রভৃতি।

রুই মাছের শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য ।। Labeo rohita । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

১। দেহ লম্বা, উদর অনেকটা গোলাকার।

২। মস্তক বড় এবং তুন্ড ভোঁতা।

৩। মুখছিদ্র অর্ধ-ডিম্বাকার এবং অনুপ্রস্থভাবে অবস্থিত।

৪। চক্ষু ও কানকো প্রশস্ত।

৫। দেহে একজোড়া সরু ও পাতলা ম্যাক্সিলারী বার্বেল উপস্থিত।

৬। একজোড়া বক্ষপাখনা, একজোড়া শ্রোণীপাখনা, একটি পৃষ্ঠপাখনা ও একটি অঙ্কীয় পাখনা থাকে

৭। পুচ্ছ পাখনা হোমোসার্কাল প্রকৃতির।

মাছ কী । রুই মাছ । Labeo rohita । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স

শীতল রক্তবিশিষ্ট জলজ মেরুদন্ডী প্রাণী যারা পাখনার সাহায্যে সাঁতার কাঁটে এবং ফুলকার সাহায্যে শ্বসন চালায় তাদেরকে মাছ বলে। রুই হলো কার্প জাতীয় মাছ। ছোট এবং কম ওজনের কার্প জাতীয় মাছকে মাইনর কার্প (বাটা, ঘনিয়া) এবং বড় ও বেশি ওজনের কার্প জাতীয় মাছকে মেজর কার্প (রুই, কাতলা, মৃগেল) বলে। স্বাভাবিক অবস্থায় রুই মাছের পোনা বছরে ৩৫-৪৫ সেমি (১-১.৫ ফুট) লম্বা এবং ৭০০-৮০০ গ্রাম ওজন হয়। কিন্তু হালদা নদীর পোনা বছরে ২-২.৫ কেজি ওজনবিশিষ্ট হয়। একারণে হালদা নদীর রেণু পোনা বা ডিম পোনার দাম প্রতি কেজি ৬০-৬৫ হাজার টাকা।