ফিঙ্গার প্রিন্টিং ।। DNA ফিঙ্গার প্রিন্টিং এর নমুনা সংগ্রহ

রক্তকণিকা (WBC), বীর্য, অস্থিমজ্জা, চুলের গোড়া, ত্বক, নখ, থুথু, লালারস, দেহের কোন অংশ প্রভৃতি নমুনা হিসেবে সংগ্রহ করা হয়। এসব কোষ DNA ফিঙ্গার প্রিন্টিং এর উৎস হিসেবে কাজ করে। DNA ফিঙ্গার প্রিন্টিং এর ১ মাইক্রোগ্রাম কলা প্রয়োজন হয়।

ফিঙ্গার প্রিন্ট ।। DNA ফিঙ্গার প্রিন্ট আবিষ্কার ।। DNA finger print

১৯৮৫ সালে বিজ্ঞানী অ্যালিক জেফরি (Alec Jeffreys) ফিঙ্গার প্রিন্টিং পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। ১৯৮৬ সালে এই পদ্ধতি আলাদতে গ্রহীত হয়।

ফিঙ্গার প্রিন্ট ।। DNA ফিঙ্গার প্রিন্ট কী ।। DNA finger print

মানুষের হাতের আঙ্গুলের ছাপ, দাগ বা চিহ্নকে টিপ সই বা ফিঙ্গার প্রিন্ট বলে। DNA এর অতি পরিবর্তনশীল অঞ্চল থেকে তেজস্ক্রিয় প্রোবের সাহায্যে নির্দিষ্ট ব্যান্ড চিহ্নিতকরণকে DNA ফিঙ্গার প্রিন্টিং বলে। যে জটিল প্রক্রিয়ায় DNA -এর ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিওটাইডের সজ্জা নির্ণয় করে জেনেটিক তথ্যে কোনো ব্যক্তিকে অন্যান্য ব্যক্তি থেকে পৃথক করা যায় তাকে DNA ফিঙ্গার প্রিন্টিং বলে। DNA (ATGC)-এর ভিন্নতার কারণে পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষের ফিঙ্গার প্রিন্ট আলাদা হয়ে থাকে। জমি রেজিস্ট্রি, বিয়ের কাবিননামা রেজিস্ট্রি, বায়োমেট্রিক সীম নিবন্ধন, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিতরণ, অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাজিরা নিশ্চিতরণ, কোন চুক্তিনামা প্রভৃতি ক্ষেত্রে ফিঙ্গার প্রিন্ট প্রয়োজন হয়।

জিন ক্লোনিং ।। PCR প্রযুক্তিতে জিন ক্লোনিং

Polymerase Chain Reaction-কে সংক্ষেপে PCR বলে। PCR হলো দ্রুততম ক্লোনিং কৌশল। DNA ভেক্টর পৃথক করে পোষক কোষে প্রবেশ করানো হলে পোষকের সাথে কাংক্ষিত জিনের বিভাজন ঘটে এবং অসংখ্য কপি তৈরী হয়। ১৯৮৪ সালে আমেরিকান বিজ্ঞানী ক্যারি মুলিস (Kary Mullis) PCR কৌশল আবিষ্কার করেন।
ধাপ-১ঃ প্রথমে DNA-এর কাংক্ষিত টুকরাকে ৯৫ ডিগ্রী সে তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হয়। এতে DNA-এর সূত্রকদ্বয় পৃথক হয়ে যায়। এর ফলে Primer গুলো নির্ধারিত স্থানে সংযুক্ত হয়। এ ধাপকে Denaturing step বলা হয়।
ধাপ-২ঃ খুব দ্রুত প্রক্রিয়াটির তাপমাত্রা নামিয়ে আনা হয়। Primer গুলো DNA সূত্রকের সাথে যুক্ত হয়। তবে প্রকৃত তাপমাত্রা Primer এর দৈর্ঘ্য এবং সিকুয়েন্স বিবেচনায় কম বেশি হতে পারে। এক একবার বিক্রিয়া ঘটানোকে একটি সাইকল বা চক্র বলা হয়।
ধাপ-৩ঃ এ পর্যায়ে বিক্রিয়াস্থলের তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রী সে. এ রাখা হয়। (dNTPs)Mg2+ আয়নের উপস্থিতিতে নিউক্লিওটাইডগুলো পরস্পর যুক্ত হয়ে নতুন সম্পুরক DNA সূত্রক তৈরী করে।
ধাপ-৪ঃ উৎপন্ন DNA অণুকে তাপ দিয়ে আবার পৃথক করা হয়। Primer-1 ৫→৩ সূত্রকের সাথে এবং Primer-2 ৩→৫ সূত্রকের সাথে যুক্ত হয়। দ্বিতীয় চক্র শেষে দুটি সূত্রক দুইটি নতুন DNA তৈরী করে। প্রতি চক্রে DNA অণুর সংখ্যা পূর্ববর্তী চক্রের দ্বিগুণ হবে।
একটি যন্ত্রের সাহায্যে DNA তৈরীর বিক্রিয়া একের পর এক চলতে থাকে। এই যন্ত্রটিকে থার্মাল সাইক্লার (Thermal cycler) বলা হয়। প্রতিটি ধাপে সময় লাগে ২-৫ মিনিট। বিক্রিয়াটি ২৫-৩৫ চক্রে সীমাবদ্ধ রাখা হয়। এক অণু DNA ৩৫ চক্র শেষে 235(2n) = 3.5×1010 অণু DNA তৈরী করবে।

জিন ক্লোনিং ।। ভেক্টর জিন ক্লোনিং প্রক্রিয়া

১।  টার্গেট DNA নির্বাচন পৃথকীকরণঃ জিন ক্লোনিং এর জন্য টার্গেট DNA নির্বাচন করা হয়। নির্বাচিত কোষকে সামান্য লাইসিস করা হয়। লাইসোজাইম (ব্যাকটেরিয়া কোষ), কাইটিনেজ (ছত্রাক কোষ), সেলুলেজ (উদ্ভিদ কোষ) এনজাইম ব্যবহার করে কোষের আবরণী নষ্ট করা হয়। এরপর লাইসিস করা কোষকে সেন্টিফিউজ টেস্টটিউবে ঢুকানো হয়। সেন্টিফিউজ টেস্টটিউবে পরিমাণ মত সিজিয়াম ক্লোরাইড দ্রবণ প্রবেশ করানো হয়। অতঃপর দ্রবণটিকে সেন্টিফিউজ করা হয়। ফলে টেস্ট টিউবের গায়ে DNAএর একটি ব্যান্ড তৈরী হয়। DNAএর সাথে অন্যান্য উপাদান মিশে হোমোজিনেট তৈরী হয়। প্রোটিয়েজ (প্রোটিন), রাইবোনিউক্লিয়েজ (RNA), অ্যামাইলেজ (শর্করা), লাইপেজ (ফ্যাট) প্রভৃতি এনজাইম ব্যবহার করে হোমোজিনেট DNA থেকে অন্যান্য উপাদান পৃথক করা হয়। পরে বিশুদ্ধ DNAকে ঠান্ডা ইথানল দ্রবণে ডুবিয়ে সুতার মতো অধঃক্ষিপ্ত করা হয়। অধঃক্ষিপ্ত DNA থেকে কাংক্ষিত DNA অংশ নির্বাচন করা হয়।

২। বাহক নির্বাচনঃ টার্গেট DNAএর প্রয়োজনীয় অংশ বহন করার জন্য বাহক নির্বাচন করা হয়। এক্ষেত্রে Agrobacterium tumefaciens নামক ব্যাকটেরিয়া উত্তম বাহক হিসেবে কাজ করে। এই ব্যাকটেরিয়ার সাইটোপ্লাজমে অবস্থিত প্লাজমিড DNAএর সাথে কাংক্ষিত DNA এর প্রয়োজনীয় অংশ সংযুক্ত করে দেয়া হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কসমিড, ফাজমিড, কৃত্রিম ক্রোমোজোম প্রভৃতি বাহক ব্যবহার হয়।

৩। টার্গেট DNA কে নির্দিষ্ট স্থানে কর্তনঃ রেস্ট্রিকশন এনজাইম প্রয়োগ করে টার্গেট DNA হতে অনেকগুলো অংশ কেটে নেয়া হয়। একই এনজাইম ব্যবহার করে বাহক প্লাজমিড DNA হতেও অনুরুপ অংশ কেটে ফেলা হয়। এই প্রক্রিয়াকে Restriction digestion বলা হয়।

৪। রিকম্বিন্যান্ট DNA তৈরীঃ  DNA লাইগেজ নামক এনজাইমের সাহায্যে টার্গেট DNAকে বাহক প্লাজমিড DNA এর সাথে সংযুক্ত করে দেয়া হয়। কাংক্ষিত DNAকে বাহক প্লাজমিড DNAএর সাথে সংযুক্তকরণের ফলে রিকম্বিন্যান্ট DNA তৈরী হয়ে যায়।

৫।  রিকম্বিন্যান্ট DNAকে পোষক দেহে প্রবেশ করানোঃ রিকম্বিন্যান্ট DNA কে বহন করার জন্য পোষক নির্বাচন করা হয়। ক্ষেত্রে E. coli ব্যাকটেরিয়া পোষক হিসেবে কাজ করে। পোষক কোষে রিকম্বিন্যান্ট DNA প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থায় ব্যাকটেরিয়া অন্য প্লাজমিড গ্রহণ করে না। ব্যাকটেরিয়া যে কালচার মিডিয়ামে জন্মে সেই আবাদ মাধ্যমে তাপ প্রয়োগ ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ করে উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করলে ব্যাকটেরিয়া অন্য প্লাজমিড গ্রহণ করে। ব্যাকটেরিয়ার দেহে রিকম্বিন্যান্ট DNA প্রবেশ করানোর প্রক্রিয়াকে ট্রান্সফরমেশন বলে।

৬। রিকম্বিন্যান্ট DNA এর সংখ্যা বৃদ্ধি বা ক্লোনিংঃ রিকম্বিন্যান্ট DNA পোষক দেহে প্রবেশ করানোর পর পোষক ব্যাকটেরিয়াকে কালচার মিডিয়ামে আবাদ করা হয়। অল্প সময়ের মধ্যে কালচার মিডিয়ামে ব্যাকটেরিয়া সংখ্যা বৃদ্ধি করে হাজার হাজার কপি তৈরী করে। সেই সঙ্গে রিকম্বিন্যান্ট DNA তৈরী হয়। এভাবে রিকম্বিন্যান্ট DNA এর সংখ্যা বৃদ্ধি করাকে জিন ক্লোনিং বলে।

জিন ক্লোনিং কী ।। Gene cloning কী

ক্লোন শব্দের অর্থ হলো হুবহু প্রতিরুপ। একই জিনোটাইপ বিশিষ্ট একাধিক জীব বা জীবাংশকে ক্লোন বলে। যে প্রক্রিয়ায় কোন নির্দিষ্ট জিন থেকে (DNA) একই রকম অসংখ্য কপি তৈরী করা হয় তাকে জিন ক্লোনিং বলে। ১৯৯৭ সালে ভেড়া ক্লোন করে ডলির জন্ম হয়।

 

প্লাজমিড ।। Plasmid ।। জৈব প্রযুক্তিতে প্লাজমিড DNA এর ভূমিকা  

১। ইনসুলিন হরমোন তৈরীতে E. coli. ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার হয়। ইনসুলিন ডায়াবেটিসে ব্যবহার হয়।

২। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং- E. coli ব্যাকটেরিয়ার গুরুত্ব অপরিসীম।

৩। ইন্টারফেরন উৎপাদনে প্লাজমিড DNA ব্যবহার করা হয়।

৪। জিন ক্লোনিং এ প্লাজমিড DNA গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৫। প্লাজমিড DNA ব্যবহার করে আমেরিকায় ট্রান্সজেনিক তুলা গাছ সৃষ্টি করা হয়েছে।

৬। জৈব প্রযুক্তির মাধ্যমে সুপার রাইস সৃষ্টি করা হয়েছে। এই ধানের ভাত খেলে রাতকানা রোগ নিরাময় হয়।

৭। জৈব প্রযুক্তির মাধ্যমে ফ্লেভার সেভার টমেটো সৃষ্টি করা হয়েছে।

৮। রিকম্বিন্যান্ট DNA প্রযুক্তির মাধ্যমে সুস্থ, সবল ও উন্নত ফসলের জাত সৃষ্টি করা হচ্ছে।

৯। বর্তমানে আলু, আপেল, তুলা, গম প্রভৃতি পতঙ্গরোধী উদ্ভিদ উদ্ভাবন করা হয়েছে।

১০। নাইট্রোজেন সংবন্ধনকারী Rhizobium ব্যাকটেরিয়া হতে নিফ জিন পৃথক করে ধান গাছের ক্রোমোজোমে প্রবেশ করানো হয়েছে। এই ধান গাছ নাইট্রোজেন সংবন্ধন করতে পারে এবং ইউরিয়া সার প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না।

১১। রিকম্বিন্যান্ট DNA প্রযুক্তি ব্যবহার করে সারা বিশ্বে বীজবিহীন ফল সৃষ্টি করা হচ্ছে।

১২। আগাছানাশক জমিতে প্রয়োগ করলে ফসলী উদ্ভিদের ব্যাপক ক্ষতি হয়। Streptomyces নামক ব্যাকটেরিয়া হতে Bar gene পৃথক করে টমেটো, আলু, তামাক প্রভৃতি গাছে প্রয়োগ করে ট্রান্সজেনিক উদ্ভিদ সৃষ্টি করা হয়েছে। এসব ট্রান্সজেনিক উদ্ভিদ আগাছানাশক দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।

প্লাজমিড ।। Plasmid ।। প্লাজমিডের ব্যবহার

১। আণবিক বংশগতিবিদ্যার গবেষণায় প্লাজমিড ব্যাপক ভাবে ব্যবহার হয়।

২। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও জিন ক্লোনিং-এ প্লাজমিড উপযোগী বাহক হিসেবে কাজ করে।

৩। উচ্চ ফলনশীল ফসল উৎপাদনে প্লাজমিডের ভূমিকা রয়েছে।

৪। জীবপ্রযুক্তিতে রোগ প্রতিরোধী জাত উৎপাদনে প্লাজমিডের ব্যবহার রয়েছে।

৫। ইনসুলিন, ইন্টারফেরন, এনজাইম প্রভৃতি তৈরীতে প্লাজমিড ব্যবহার হয়।

৬। বিভিন্ন ধরনের রোগ নির্ণয়ে প্লাজমিডের ব্যবহার রয়েছে।

৭। পতঙ্গ ও আগাছা প্রতিরোধী উদ্ভিদ সৃষ্টিতে প্লাজমিডের ব্যবহার রয়েছে।

প্লাজমিড ।। Plasmid ।। প্লাজমিডের সংখ্যা ভিত্তিক প্রকারভেদ

১। সিঙ্গেল কপি প্লাজমিডঃ ব্যাকটেরিয়ার কোষে একটি মাত্র প্লাজমিড থাকলে তাকে সিঙ্গেল কপি প্লাজমিড বলে।

২। মাল্টিকপি প্লাজমিডঃ ব্যাকটেরিয়ার কোষে অনেকগুলো প্লাজমিড (১০০০) থাকলে তাকে মাল্টিকপি প্লাজমিড বলে।

প্লাজমিড ।। Plasmid ।। প্লাজমিডের কাজ ভিত্তিক প্রকারভেদ

১। F F © প্লাজমিডঃ যে প্লাজমিড ব্যাকটেরিয়ার এককোষ থেকে অন্য কোষে জেনেটিক বস্তু স্থানান্তর করে তাকে F প্লাজমিড বলে। যে প্লাজমিড ব্যাকটেরিয়ার কোষে Pili তৈরী করে যৌন জননে সাহায্য করে তাকে F ©  প্লাজমিড বলে।

২। R প্লাজমিডঃ যে সব প্লাজমিডে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জিন থাকে তাকে R  প্লাজমিড বলে। R6 প্লাজমিড ৬টি গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন। ইহা একটি জিন মার্কার। এতে টেট্রাসাইক্লিন অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জিন থাকে।

৩। Col প্লাজমিডঃ যে সব প্লাজমিড কলিসিন নামক বিষাক্ত প্রোটিন উৎপন্ন করে তাকে কোল প্লাজমিড বলে। কলিসিন সংবেদনশীল E. coli কোষকে ধ্বংস করতে পারে। প্লাজমিডে ভিব্রিওসিন উৎপাদনকারী জিন থাকে। ভিব্রিওসিন সংবেদনশীল Vibrio cholerae কোষকে ধ্বংস করতে পারে।

৪। ভিরুলেন্স প্লাজমিডঃ যে সব প্লাজমিড রোগ সৃষ্টি করে তাদেরক ভিরুলেন্স প্লাজমিড বলে। Agrobacterium tumefaciens এর Ti প্লাজমিড দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদে ক্রাউন গল রোগ সৃষ্টি করে।

৫। ডিগ্রেডেটিভ প্লাজমিডঃ যে সব প্লাজমিড ব্যাকটেরিয়ার অস্বাভাবিক উপাদান টলুইন, স্যালিসাইলিক এসিড প্রভৃতিকে দ্রæত পরিবর্তন করতে পারে তাকে ডিগ্রেডেটিভ প্লাজমিড বলে।