যে প্রক্রিয়ায় পরিপাক নালি হতে খাদ্যের অর্ধ-কঠিন বা নরম পরিপাক বর্জ্য মল হিসেবে দেহের বাইরে নির্গত হয় তাকে মলত্যাগ ডেফিকেশন বা ইজেসশন (egestion) বলে। কোলন পেশির সংকোচনী ঢেউ বা পেরিস্ট্যালসিস প্রক্রিয়ায় মল জাতীয় পদার্থ বৃহদান্ত্র থেকে মলাশয়ে প্রেরিত হয়। বৃহদান্ত্রের প্রাচীর থেকে নিঃসৃত পিচ্ছিল মিউকাস পদার্থ লুব্রিকেন্টের মতো মল নির্গমণকে সহজ করে। মলাশয় একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় পূর্ণ হলে এর প্রাচীরে চাপ সৃষ্টি হয়। এতে ডেফিকেশন প্রতিবর্তী ক্রিয়া ঘটে এবং মল ত্যাগের ইচ্ছা জাগে। মলাশয় প্রাচীর এবং পেলভিক পেশির চাপে মল পায়ু নালিতে প্রবেশ করে। পায়ু নালির পেরিস্ট্যালসিস ক্রিয়ায় মল পায়ুপথে বাইরে নির্গত হয়। পায়ু নালিতে অবস্থিত দুইটি স্ফিংটার পেশি মল নির্গমণ নিয়ন্ত্রণ করে। ব্যথা, ভয়, তাপমাত্রা, শারীরিক বা স্নায়বিক জটিলতা মল ত্যাগের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে।
বৃহদান্ত্রের কাজ আলোচনা । Function of Large Intestine । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
ক্ষুদ্রান্ত্রের ইলিয়ামের পর থেকে পায়ু পর্যন্ত বিস্তৃত মোটা, নলাকার ও খাঁজযুক্ত অংশকে বৃহদান্ত্র বলে। মানুষের বৃহদান্ত্রের কাজ বর্ণনা করা হলো।
১। শোষণ ও পুনঃশোষণঃ বৃহদান্ত্র দ্বারা পানি, খনিজ লবণ, সোডিয়াম, ক্লোরাইড প্রভৃতি শোষিত হয়। পরিপাক বর্জ্যে বিদ্যমান পানির ৭০-৮০% বৃহদান্ত্র দ্বারা পুনঃশোষিত হয়।
২। অণুজীবের ভান্ডারঃ বৃহদান্ত্রের অ্যাপেনডিক্সকে উপকারী অণুজীবের সুরক্ষিত ভান্ডার বলা হয়। মানুষের কোলনে ৫০০ প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া বসবাস করে। অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস প্রাপ্ত হলে অ্যাপেনডিক্সের ব্যাকটেরিয়া অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার জীবগোষ্ঠিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে। এসব ব্যাকটেরিয়া অপ্রাচ্য খাদ্য উপাদানকে ভেঙ্গে ক্ষুদ্র শিকল ফ্যাটি এসিড উৎপন্ন করে।
৩। গাঁজন ও পাচনঃ বৃহদান্ত্রে ৫০০ প্রজাতির মিথোজীবী ব্যাকটেরিয়া থাকে। এসব ব্যাকটেরিয়া অপ্রাচ্য খাদ্য উপাদানকে গাঁজন প্রক্রিয়ায় ভেঙ্গে ক্ষুদ্র শিকল ফ্যাটি এসিড উৎপন্ন করে এবং কার্বন ডাই অক্সাইড, হাইড্রোজেন ও মিথেন গ্যাস মুক্ত করে। ক্ষুদ্র ফ্যাটি এসিড (অ্যাসিটিক এসিড, প্রোপাওনিক এসিড ও বিউটারিক এসিড) কোলনের প্রাচীরের কোষে শক্তি সরবরাহ করে।
৪। মল উৎপাদনঃ ক্ষুদ্রান্ত্র থেকে তরল কাইম বা মন্ড বৃহদান্ত্রে প্রবেশ করে এবং শোষণের মাধ্যমে আর্দ্র ও নরম মলে পরিনত হয়। সাধারণত ৩৫০ গ্রাম মন্ড থেকে ১৩৫ গ্রাম মল উৎপন্ন হয়।
খাদ্যসার শোষণ প্রক্রিয়া ।। Absorption । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
যে প্রক্রিয়ায় পরিপাককৃত খাদ্যসার পরিপাক নালি হতে রক্ত ও লসিকায় প্রবেশ করে তাকে খাদ্যসার শোষণ বা শোষণ বলে। ক্ষুদ্রান্ত্র হলো প্রধান শোষণ স্থান। ক্ষুদ্রান্ত্র প্রায় ৯০% খাদ্যসার শোষণ করে। পাকস্থলী ও বৃহদান্ত্র দ্বারা শোষিত হয় ১০%। ক্ষুদ্রান্ত্রের আবরণী ভাঁজ হয়ে আঙ্গুলের মতো অভিক্ষেপ সৃষ্টি করে। একে ভিলাই বলে। ভিলাই অন্ত্রের শোষণ ক্ষমতা ৪০গুণ বৃদ্ধি করে। মানুষের ক্ষুদ্রান্ত্রে প্রায় ৫,০০,০০০ ভিলাই থাকে। ভিলাইয়ের কোষ গুলোতে যে সুক্ষ্ম অভিক্ষেপ থাকে তাকে মাইক্রোভিলাই বলে। মাইক্রোভিলাই গুলো একত্রে ব্রাশ বর্ডার সৃষ্টি করে। ব্রাশ বর্ডার শোষণ প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। মাইক্রোভিলাই অন্ত্রের শোষণ ক্ষমতা ৬০গুণ বৃদ্ধি করে। ভিটামিন, খনিজলবণ ও পানির সাথে খাদ্যসার এন্ডোসাইটোসিস পদ্ধতিতে শোষিত হয়।
১। প্রোটিন শোষণঃ প্রোটিন পরিপাক হয়ে অ্যামাইনো এসিড উৎপন্ন করে। অ্যামাইনো এসিড হিসেবেই ক্ষুদ্রান্ত্রে প্রোটিন শোষিত হয়। তবে পেপটোন, প্রোটিওজ, পেপটাইড প্রভৃতি অর্ধজটিল প্রোটিনও খুব অল্প পরিমাণে শোষিত হয়। ডিমের সাদা অংশ, চিংড়ী, কাকড়া প্রভৃতি অপরিবর্তিত অবস্থায় শোষিত হয়। ডিওডেনাম ও জেজুনামের ভিলাই দ্বারা সক্রিয় শোষণ, ব্যাপন এবং ফ্যাগোসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় অ্যামাইনো এসিড শোষিত হয়। সাধারণত L-অ্যামাইনো এসিড সক্রিয় পদ্ধতিতে এবং D–অ্যামাইনো এসিড ব্যাপনের মাধ্যমে শোষিত হয়। ভিলাইয়ের কৌশিক নালিকা প্রোটিন শোষণের কাজ করে। থাইরক্সিন হরমোন প্রোটিন শোষণ নিয়ন্ত্রণ করে।
২। শর্করা শোষণঃ শর্করা পরিপাক হয়ে গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ, গ্যালাকটোজ, ল্যাকটোজ, সুক্রোজ, জাইলোজ, ম্যানোজ প্রভৃতি মনোস্যাকারাইডে পরিনত হয়। ক্ষুদ্রান্ত্র মনোস্যাকারাইড হিসেবেই শর্করা শোষণ করে। তবে কিছু শর্করা ডাইস্যাকারাইড হিসেবেও শোষিত হয়। মনোস্যাকারাইডের মধ্যে ৮০% গ্লুকোজ এবং ২০% ফ্রুক্টোজ ও গ্যালাকটোজ হিসেবে শোষিত হয়। Na+ এবং ATP এর সহায়তায় জেজুনামের ভিলাইয়ের কৌশিক নালিকা গ্লুকোজ শোষণ করে। ফ্রুক্টোজ শোষিত হয় ব্যাপন প্রক্রিয়ায়। সুক্রোজ ও ল্যাকটোজ ডিওডেনাম ও মধ্য ক্ষুদ্রন্ত্রে শোষিত হয়।
৩। লিপিড শোষণঃ লিপিড পরিপাক হয়ে ফ্যাটি এসিড, গিøসারল, মনোগিøসারাইড ও কোলেস্টেরলে পরিনত হয়। ফ্যাটি এসিড পরিশোষণ একটি জটিল প্রক্রিয়া। ফ্যাটি এসিড, মনোগিøসারাইড ও পিত্ত লবণ একত্রে যুক্ত হয়ে মিসেল কণা গঠন করে। মিসেল কণা ডিওডেনাম ও মধ্য ক্ষুদ্রান্ত্র দ্বারা শোষিত হয়। থায়োকাইনেজ এনজাইমের প্রভাবে ফ্যাটি এসিড সক্রিয় ফ্যাটি এসিডে পরিনত হয়। সক্রিয় ফ্যাটি এসিড, গিøসারল ও প্রোটিন একত্রে যুক্ত হয়ে ট্রাইগিøসারাইড গঠন করে। একে কাইলোমাইক্রন কণা বলে। কাইলোমাইক্রন কণা ক্ষুদ্রান্ত্রের লসিকা নালিতে প্রবেশ করে। লসিকা নালির শাখা সাদা হলে তাকে ল্যাকটিয়েল বলে। লসিকা নালির মধ্য দিয়ে কাইলোমাইক্রন রক্তের প্লাজমায় প্রবেশ করে। প্লাজমায় অবস্থিত এনজাইম কাইলোমাইক্রন বা লিপোপ্রোটিনকে ভেঙ্গে ফ্যাটি এসিড ও গিøসারল সৃষ্টি করে।
৪। পানি শোষণঃ ক্ষুদ্রান্ত্রের ভিলাই–এর এপিথেলিয়াল কোষ দ্বারা পানি শোষিত হয়। সাধারণত প্রতি ঘন্টায় ২০০–৪০০ মিলি পানি শোষিত হয়।
৫। খনিজলবণ শোষণঃ বৃদ্রান্ত্রের ভিলাই–এর এপিথেলিয়াল কোষ দ্বারা খনিজলবণ শোষিত হয়।
৬। ভিটামিন শোষণঃ ক্ষুদ্রান্ত্রের ভিলাই–এর এপিথেলিয়াল কোষ দ্বারা পানি বা চর্বিতে দ্রবীভূত অবস্থায় ভিটামিন শোষিত হয়।
খাদ্যসার শোষণ দেহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রক্রিয়া। পরিপাকের মাধ্যমে প্রোটিন হতে অ্যামাইনো এসিড, শর্করা হতে গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ এবং লিপিড হতে ফ্যাটি এসিড ও গিøসারল উৎপন্ন হয়। ক্ষুদ্রান্ত্র এ সব পরিপাককৃত খাদ্যসার শোষণ করে। এরপর রক্তের মাধ্যমে দেহের বিভিন্ন অংশে পৌছে। দেহ কোষ এ সব খাদ্যসার গ্রহণ করে এবং সুস্থ, সবল ও সতেজ থাকে।
খাদ্য পরিপাকে স্নায়ুতন্ত্রের ভূমিকা । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
খাদ্য পরিপাক প্রক্রিয়া স্নায়ুতন্ত্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হলে তাকে স্নায়ুজ নিয়ন্ত্রণ বা Nervous control বলে। মানুষের বৃহদন্ত্রের প্রাচীরে বিদ্যমান স্নায়ুজালক খাদ্যগ্রহণ ও পরিপাকে প্রধান ভূমিকা পালন করে। এ মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসে ক্ষুধা কেন্দ্র রয়েছে। ইহা মানুষের ক্ষুধা ও খাদ্য গ্রহণ নিয়ন্ত্রণ করে। দুইটি স্নায়ু মানুষের খাদ্য পরিপাক নিয়ন্ত্রণ করে।
১। অন্তর্নিহিত স্নায়ুজালক বা Intrinsic plexuses
২। বহির্নিহিত স্নায়ুজালক বা Extrinsic plexuses
১। অন্তর্নিহিত স্নায়ুজালক বা ইনট্রিনসিক প্লেক্সাসঃ যে স্নায়ুতন্ত্র পৌষ্টিকনালীর ভিতর থেকে উদ্দীপনা গ্রহণ করে পরিপাক নিয়ন্ত্রণ করে তাকে অন্তর্নিহিত স্নায়ুজালক বলে। একে অন্ত্রীয় বা এন্টেরিক স্নায়ুতন্ত্র বলে। এন্টেরিক স্নায়ুতন্ত্রকে মানুষের দ্বিতীয় মস্তিষ্ক বলা হয়। ইহা অন্ননালি, পাকস্থলী, ক্ষুদ্রান্ত্র ও কোলনের প্রাচীরে জালের মতো বিস্তৃত থাকে এবং সেখান থেকে উদ্দীপনা গ্রহণ করে। দুই ধরনের অন্তর্নিহিত স্নায়ুজালক সংক্ষিপ্ত প্রতিবর্তী ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।
(i) মায়েনটারিক স্নায়ুজালকঃ ইহা পরিপাকতন্ত্রের মসৃণ পেশির সঙ্কোচন বা পেরিস্ট্যালসিস ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।
(ii) সাবমিউকোসাল স্নায়ুজালকঃ ইহা পরিপাকতন্ত্রের রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে।
২। বহির্নিহিত স্নায়ুজালক বা এক্সট্রিনসিক প্লেক্সাসঃ যে স্নায়ুতন্ত্র পৌষ্টিকনালীর বাহির থেকে উদ্দীপনা গ্রহণ করে পরিপাক নিয়ন্ত্রণ করে তাকে বহির্নিহিত স্নায়ুজালক বলে। ইহা সিমপ্যাথেটিক ও প্যারাসিমপ্যাথেটিক হতে সৃষ্টি হয়। ইহা পরিপাকতন্ত্রের দীর্ঘ প্রতিবর্তী ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। এরা অ্যাসিটালকোলিন এবং অ্যাডরেনালিন পদার্থ মুক্ত করে। অ্যাসিটালকোলিন পৌষ্টিকনালির ভিতর দিয়ে খাদ্য ও পানীয় প্রবাহে শক্তি প্রয়োগ করে। এছাড়া পাকস্থলী ও অগ্ন্যাশয় হতে অধিক পরিমাণ পাচক রস ক্ষরণে সাহায্য করে। অ্যাডরেনালিন পাকস্থলী ও অন্ত্রের পেশিকে শিথিল করে এবং রক্ত প্রবাহ হ্রাস করে।
পরিপাকে হরমোনের ভূমিকা । Hormonal digestion । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
১। গ্যাস্ট্রিনঃ ইহা পাকস্থলীর জি–কোষ হতে উৎপন্ন হয় এবং গ্যাস্ট্রিক রস নিঃসরণে সাহায্য করে। গ্যাস্ট্রিন হরমোন ঐঈষ ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করে।
২। সোমাটোস্টাটিনঃ এই হরমোন জি–কোষ এবং হাইপোথ্যালামাস হতে নিঃসৃত হয় এবং গ্যাস্ট্রিন ক্ষরণ নিবারণ করে। ইহা পাকস্থলীর ক্ষরণ এবং অগ্ন্যাশয় রসের ক্ষরণও হ্রাস করে।
৩। ক্যালিক্রাইনঃ ইহা লালা গ্রন্থি হতে নিঃসৃত হয় এবং লালা গ্রন্থির রক্ত নালিকাকে প্রসারিত করে। এতে রক্ত সঞ্চালন বেড়ে যায়। ফলে লালারস ক্ষরণের পরিমাণও বৃদ্ধি পায়।
৪। সিক্রেটিনঃ সিক্রেটিন হরমোন অগ্ন্যাশয় ও যকৃত কোষে বাইকার্বোনেট আয়ন তৈরীতে সাহায্য করে। বাইকার্বোনেট আয়নের কারণে অগ্ন্যাশয় রস ও পিত্তরস বেশি ক্ষরীয় হয়। ফলে পরিপাকে ক্ষারীয় পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
৫। কোলেসিস্টোকাইনিনঃ ইহা ডিওডেনামে পিত্তরস নিঃসরণে সাহায্য করে। ১৯২৮ সালে বিজ্ঞানী আইভি ও ওল্ডবার্জ কোলেসিস্টোকাইনিন হরমোন আবিষ্কার করেন।
৬। ভিলিকাইনিনঃ ভিলিকাইনিন হরমোন ক্ষুদ্রান্ত্রের ভিলাইকে সবল করে শোষণ ক্ষমতা বাড়ায়।
৭। টেস্টোস্টেরণ ও ইস্ট্রোজেনঃ টেস্টোস্টেরণ ও ইস্ট্রোজেন প্রোটিন বিপাক নিয়ন্ত্রণ করে।
৮। প্যানক্রিওজাইনিনঃ এই হরমোন অগ্ন্যাশয় রস নিঃসরণে সাহায্য করে। ১৯৪৩ সালে হারপার ও রেপার প্যানক্রিওজাইনিন হরমোনটি আবিষ্কার করেন।
৯। এন্টারোক্রাইনিনঃ এ হরমোন আন্ত্রিক রস ক্ষরণে সহায়তা করে। আন্ত্রিক রস পরিপাকে অংশ গ্রহণ করে।
১০। ডিওক্রাইনিনঃ ইহা ডিওডেনামের প্রাচীর থেকে উৎপন্ন হয় এবং আন্ত্রিক রস ক্ষরণে সহায়তা করে।
১১। পেপটাইড YYঃ ইলিয়ামের প্রাচীর থেকে পেপটাইড YY ক্ষরিত হয়। ইহা খাদ্যকে ধীর গতিতে প্রবাহিত করে। এতে খাদ্য পরিপাক ও শোষণ সম্পন্ন হয়।
১২। গ্যাস্ট্রিক ইনহিবিটরি পেপটাইডঃ ডিওডেনামের প্রাচীর থেকে গ্যাস্ট্রিক ইনহিবিটরি পেপটাইড ক্ষরিত হয়। ইহা পাকস্থলী থেকে অন্ত্রে খাদ্য প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করে। ইহা ইনসুলিন ক্ষরণের সূচনা করে।
১৩। ভেসোয়াকটিভ ইনটেস্টাইনাল পেপটাইডঃ ক্ষুদ্রান্ত্রের এপিথেলিয়াল প্রাচীর থেকে এই হরমোন ক্ষরিত হয়। ইহা অন্ত্রের প্রাচীরের রক্ত জালিকাগুলোকে প্রসারিত করে। গ্যাস্ট্রিক এসিড নিঃসরণ বন্ধ করে।
১৪। ক্ষুধা ও তৃপ্তি নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনঃ মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসে ক্ষুধা কেন্দ্র রয়েছে। ইহা মানুষের ক্ষুধা ও খাদ্য গ্রহণ নিয়ন্ত্রণ করে। পেপটাইড YY, গ্যাস্ট্রিক ইনহিবিটরি পেপটাইড (GIP), ভেসোয়াকটিভ ইনটেস্টাইনাল পেপটাইড (VIP), গøুকাগন লাইক পেপটাইড–১ (GLP-1), প্যানক্রিয়েটিক পলিপেপটাইড (PP) এবং গ্রিলিন মস্তিষ্কে নিউরোট্রান্সমিটার হিসেবে কাজ করে। এদের মধ্যে পেপটাইড YY, প্যানক্রিয়েটিক পলিপেপটাইড এবং গ্রিলিন খাদ্য গ্রহণ নিয়ন্ত্রণ করে। রক্তে গ্রিলিন হরমোনের মাত্রা বেড়ে গেলে ক্ষুধার উদ্রেগ হয়। খাদ্য গ্রহণের সময় রক্তে প্যানক্রিয়েটিক পলিপেপটাইড ও পেপটাইড YY হরমোনের মাত্রা বেড়ে গেলে খাবারে তৃপ্তি আসে।
খাদ্য পরিপাকে ক্ষুদ্রান্ত্রের ভূমিকা । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
খাদ্যের যান্ত্রিক পরিপাক
১। ক্ষুদ্রান্ত্রে খাদ্যের সেগমেন্টেশন ঘটে। খাদ্য আন্ত্রিক রস ও মিউকাসের সাথে ভালভাবে মিশ্রিত হয়। খাদ্য সামনে পিছনে সর্বত্র সম ভাবে সঞ্চালিত হয়।
২। পেরিস্ট্যালসিস সঞ্চালনের মাধ্যমে কাইম ধীরগতিতে প্রবাহিত হয়।
৩। আন্ত্রিকরসের মিউসিন খাদ্যের সাথে মিশে খাদ্যকে পিচ্ছিল করে এবং এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত হয়।
৪। ব্রুনার্স গ্রন্থি ও গবলেট কোষ থেকে নিঃসৃত মিউকাস ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রাচীরকে এনজাইমের প্রভাব থেকে রক্ষা করে।
৫। পিত্তরস জীবাণুর ক্রিয়া কমায় এবং পিত্তলবণ খাদ্যের গতি বৃদ্ধি করে।
৬। কোলেসিস্টোকাইনিন হরমোন পিত্তাশয়ের সংকোচন ঘটায়। ফলে পিত্তরস ক্ষুদ্রান্ত্রে পৌছে।
৭। পিত্তলবণ স্নেহদ্রব্যকে ইমালসিফাই করে সাবানের ফেনার মতো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণায় পরিনত করে।
খাদ্যের রাসায়নিক পরিপাক
১। প্রোটিন পরিপাক
(i) অ্যামাইনো পেপটাইডেজ এনজাইম পলিপেপটাইডকে ভেঙ্গে অ্যামাইনো এসিডে রুপান্তরিত করে।
(ii) প্রোলিডেজ এনজাইম পেপটাইডকে ভেঙ্গে প্রোলিনে পরিনত করে।
(iii) ট্রাইপেপটাইডেজ এনজাইমের প্রভাবে ট্রাইপেপটাইড হতে ডাইপেপটাইড ও অ্যামাইনো এসিড উৎপন্ন হয়।
(iv) ডাইপেপটাইডেজ এনজাইম ডাইপেপটাইডকে ভেঙ্গে অ্যামাইনো এসিডে পরিনত করে।
২। শর্করা পরিপাক
(i) অ্যামাইলেজ এনজাইম স্টার্চ ও ডেক্সটিনকে ভেঙ্গে মল্টোজ, মল্টোট্রায়োজ ও ক্ষুদ্র ডেক্সটিনে পরিনত করে।
(ii) আইসোমল্টেজ এনজাইমের প্রভাবে আইসোমল্টোজ হতে মল্টোজ ও গ্লুকোজ উৎপন্ন হয়।
(iii) মল্টোট্রায়েজ এনজাইম মল্টোট্রায়োজকে ভেঙ্গে গ্লুকোজে পরিনত করে।
(iv) মল্টেজ এনজাইমের প্রভাবে মল্টোজ হতে গ্লুকোজ উৎপন্ন হয়।
(v) সুক্রেজ এনজাইম সুক্রোজকে ভেঙ্গে গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজে পরিনত করে।
(vi) ল্যাকটেজ এনজাইমের প্রভাবে ল্যাকটোজ হতে গ্লুকোজ ও গ্যালাকটোজ উৎপন্ন হয়।
৩। লিপিড পরিপাক
(i) লাইপেজ নামক এনজাইম ট্রাইগিøসারাইড ও ডাইগিøসারাইডকে ভেঙ্গে ফ্যাটি এসিড, গিøসারল ও মনোগিøসারাইডে পরিনত করে।
(ii) মনোগিøসারিডেজ এনজাইমের প্রভাবে মনোগিøসারাইড হতে ফ্যাটি এসিড ও গিøসারল উৎপন্ন হয়।
খাদ্য পরিপাকে অগ্ন্যাশয়ের ভূমিকা । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
১। প্রোটিন পরিপাক
(i) নিস্ক্রিয় ট্রিপসিনোজেন এন্টারোকাইনেজ এনজাইমের প্রভাবে সক্রিয় ট্রিপসিনে পরিনত হয়। ট্রিপসিন পেপটোনকে ডাইপেপটাইড ও পলিপেপটাইডে পরিনত করে।
(ii) নিস্ক্রিয় কাইমোট্রিপসিনোজেন ট্রিপসিন এনজাইমের সহায়তায় সক্রিয় কাইমোট্রিপসিনে পরিনত হয়। কাইমোট্রিপসিন দুধের কেসিনকে ভেঙ্গে প্যারাকেসিনে পরিনত করে।
(iii) ইলাস্টেজ এনজাইম ইলাস্টিনকে ভেঙ্গে পেপটাইডে রুপান্তরিত করে।
(রা) কোলাজিনেজ এনজাইমের কার্যকারীতায় কোলাজেন হতে পেপটাইড উৎপন্ন হয়।
২। শর্করা পরিপাক
(i) অ্যামাইলেজ নামক এনজাইম স্টার্চ ও গ্লাইকোজেনকে ভেঙ্গে মল্টোজ, মল্টোট্রায়োজ ও ডেক্সটিনে পরিনত করে।
(ii) মল্টেজ এনজাইমের উপস্থিতিতে মল্টোজ গ্লুকোজে রুপান্তরিত হয়।
৩। লিপিড পরিপাক
(i) লাইপেজ নামক এনজাইম লিপিডকে ভেঙ্গে ফ্যাটি এসিড ও গিøসারলে পরিনত করে।
(ii) ফসফোলাইপেজ এনজাইমের উপস্থিতিতে ফসফোলিপিড ফ্যাটি এসিড ও মনোগিøসারাইডে রুপান্তরিত হয়
খাদ্য পরিপাকে পিত্তরস ভূমিকা । যকৃত রসের ভূমিকা । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
১। পিত্তরসের পিত্তলবণ স্নেœহ পদার্থকেইমালসিফাই করে লাইপেজের ক্রিয়ার জন্য উপযোগী করে তোলে।
২। পিত্তলবণ লাইপেজের সক্রিয়ক বা অ্যাক্টিভেটর হিসেবে কাজ করে।
৩। পিত্তরস খাদ্য পরিপাকের অ¤øত্ব প্রশমিত করে ক্ষারীয় পরিবেশ সৃষ্টি করে।
৪। পিত্তরস চর্বিতে দ্রাব্য ভিটামিন সমুহকে পরিশোষণে সহায়তা করে।
৫। পিত্তলবণ কোলনের পেরিস্ট্যালসিস বাড়িয়ে মল নিষ্কাশনে সহায়তা করে।
৬। পিত্তরসের মাধ্যমে টক্সিন, কোলেস্টেরল, পিত্তরঞ্জক, দস্তা, তামা, পারদ প্রভৃতি নির্গত হয়।
খাদ্য পরিপাকে পাকস্থলীর ভূমিকা । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
১। খাদ্যের যান্ত্রিক পরিপাক
(i) চূর্ণ–বিচূর্ণ লালামিশ্রিত খাদ্যমন্ড কার্ডিয়াক অরিফিস হয়ে পাকস্থলীতে প্রবেশ করে। এসময় কার্ডিয়াক ও পাইলোরিক স্ফিংক্টার ছিদ্রপথ বন্ধ হয়ে যায়।
(ii) পাকস্থলীতে পেরিস্ট্যালসিস ঢেউ শুরু হয়। পেরিস্ট্যালসিস ঢেউ পাকস্থলীর ফান্ডাস থেকে শুরু এবং পাইলোরিকে শেষ হয়।
(iii) চক্রাকার পেশি ও অনুদৈর্ঘ্য পেশির সংকোচনের ফলে পেরিস্ট্যালসিস চলন ঘটে। খাদ্যদলার উপরের দিকে চক্রাকার পেশি এবং নিচের দিকে অনুদৈর্ঘ্য পেশি অবস্থান করে।
(iv) খাদ্যদলা গ্রাসনালির শেষপ্রান্তে পৌছালে কার্ডিয়াক স্ফিংক্টার প্রসারিত হয় এবং খাদ্য পাকস্থলীতে নিক্ষিপ্ত হয়।
(v) পাকস্থলীর ভিতরে খাদ্যবস্তুর সাথে গ্যাস্ট্রিক রস ও হাইড্রোক্লোরিক এসিড মিশে কাইমে পরিনত হয়।
(vi) পাকস্থলী থেকে নিঃসৃত HCl খাদ্যের জীবাণুকে ধ্বংস করে। পরিপাকের জন্য অম্লীয় পরিবেশ সৃষ্টি করে।
২। খাদ্যের রাসায়নিক পরিপাক
(i) নিস্ক্রিয় পেপসিনোজেন HCl –এর প্রভাবে সক্রিয় পেপসিনে পরিনত হয়। পেপসিন প্রোটিনকে ভেঙ্গে প্রোটিওজ ও পেপটোনে পরিনত করে।
(ii) জিলেটিনেজ এনজাইম জিলেটিনকে ভেঙ্গে পেপটোন ও পলিপেপটাইড উৎপন্ন করে।
(iii) লাইপেজ এনজাইম লিপিডকে ভেঙ্গে ফ্যাটি এসিড, গিøসারল ও মনোগিøসারাইড উৎপন্ন করে।
খাদ্য পরিপাকে লালারসের ভূমিকা । ড. সিদ্দিক পাবলিকেশন্স
যান্ত্রিক পরিপাক
১। লালারসের পানি খাদ্যকে সিক্ত ও নরম করে। পানি মুখকে আর্দ্র করে এবং স্বাদ অনুভব করে। লালারস খাদ্যকে চর্বণে এবং গলাধঃকরণে সাহায্য করে।
২। জিহ্বার স্বাদ কুঁড়িগুলো সিক্ত খাদ্য থেকে অনুভূতি গ্রহণ করে। তখন খাদ্যের স্বাদ বুঝা সম্ভব হয়।
৩। মিউসিন খাদ্যকে লুবিকেট দলায় পরিনত করে।
৪। লালা খাদ্যকে চর্বণ ও গলাধঃকরণে সহায়তা করে। এসিড ও ক্ষারকে প্রশমন করতে সাহায্য করে।
৫। লালায় বিদ্যমান ক্লোরাইড অ্যামাইলেজকে সক্রিয় করে।
৬। লালার বাইকার্বনেট বাফার হিসেবে কাজ করে। ইহা মুখের এসিডের শক্তি কমিয়ে দাঁতের এনামেল ক্ষয়রোধ করে।
৭। লালার ইমিউনোগ্লোবিউলিন এন্টিব্যাকটেরিয়াল হিসেবে কাজ করে।
৮। লালা দাঁত থেকে খাদ্যের ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করে এবং মুখের নরম অংশের সংবেদনশীলতা বজায় রাখে।
রাসায়নিক পরিপাক
১। টায়ালিন এনজাইম স্টার্চ ও গ্লাইকোজেনকে ভেঙ্গে মল্টোজ, মল্টোট্রায়োজ ও আইসোমল্টোজে পরিনত করে
২। মল্টেজ এনজাইমের প্রভাবে মল্টোজ গ্লুকোজে রুপান্তরিত হয়।